ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) পঞ্চম সমাবর্তনের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। ২০১৮ সালে সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ আট বছরেরও বেশি সময়। এ সময়ে হাজারো শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও এখনো পাননি সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এরই মধ্যে বিগত কয়েকটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাবর্তনের আশ্বাস দেওয়া হলেও কোনো ঘোষণাই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ৪৭ বছরে ইবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র চারটি সমাবর্তন। প্রথম সমাবর্তন হয় ১৯৯৩ সালের ২৭ এপ্রিল, দ্বিতীয়টি ১৯৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর, তৃতীয়টি ২০০২ সালের ২৮ মার্চ এবং সর্বশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-উর-রাশিদ আসকারীর তত্ত্বাবধানে। এরপর আর কোনো সমাবর্তন আয়োজন করা হয়নি। ফলে প্রতিবছর নতুন নতুন সমাবর্তনের অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
চতুর্থ সমাবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন প্রশাসনের সময় একাধিকবার পঞ্চম সমাবর্তনের আশ্বাস দেওয়া হয়। ২০২২ সালে দ্রুত সমাবর্তনের প্রস্তুতির কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালাম ২০২৪ সালের মধ্যেই পঞ্চম সমাবর্তন আয়োজনের ঘোষণা দেন। তবে শেষ পর্যন্ত ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তিনি পদচ্যুত হন।
২০২৫ সালেও সমাবর্তনের দাবিতে সরব হন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন সময়ে তারা জানান, দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হওয়ায় অনেকেই আনুষ্ঠানিক সনদ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেসময় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সমাবর্তন আয়োজনের কথা জানালেও তিনি ব্যর্থ হন।
এদিকে দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হওয়ায় বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। তাদের প্রত্যাশা, অতীতের মতো আরেকটি আশ্বাস নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করে দ্রুত পঞ্চম সমাবর্তন আয়োজন করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে প্রশাসন বলছে, এখনই সমাবর্তন আয়োজনের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এম তানভীর আসলাম বলেন, সর্বশেষ ২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়, যা আজ থেকে ৮ বছর আগের কথা। গত ৮ বছরে হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ইতি টেনেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি প্রশাসন বারবার সমাবর্তনের আশ্বাস দিয়েও শিক্ষার্থীদের আশাহত করেছে। এবার চাই, প্রশাসন একটি সুন্দর মুহূর্ত সমাবর্তনের মাধ্যমে আমাদের উপহার দিক।
আইন বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তন্ময় ঘোষ বলেন, যেখানে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র চারবার সমাবর্তন হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ সমাবর্তনের আয়োজন করবে, যাতে অপেক্ষমাণ সব শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্য এই সম্মানজনক মুহূর্তটি উপভোগ করতে পারেন।
ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আকিব হাসান বলেন, সমাবর্তন শুধু একটি সার্টিফিকেট বিতরণের দিন বা অনুষ্ঠান না। এটা একজন শিক্ষার্থীর ৭ থেকে ৮ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। সবার মতো আমিও চাই ইবিতে দ্রুত একটি সমাবর্তন হোক। দ্রুত একটি সমাবর্তনের মাধ্যমে ইবিতে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হোক। এরপর থেকে এমন একটি কালচার তৈরি হোক যেন সমাবর্তন কালচারটা ইবিতে নিয়মিত থাকে।
তবে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। সমাবর্তন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে থাকা প্রয়োজন, যেটা এখন নেই। যেটা করতে পারবো না সেটা দিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে লাভ নেই।


