পিংক বাসে যাত্রীখরা, দিনে লোকসান ৬০ হাজার টাকা

পিংক বাসে যাত্রীখরা, দিনে লোকসান ৬০ হাজার টাকা
ঢাকার তেজগাঁওয়ে ১৮ আগস্ট পিংক বাস সেবা উদ্বোধনের সময় তিন নারী চালক। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

বুধবার বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট। বিআরটিসির কমলাপুর ডিপো থেকে মিরপুর-১২ এর উদ্দেশে ছেড়ে যায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত পিংক বাস। তবে সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ অফিসই তখনও শেষ হয়নি। বাসটি মতিঝিল হয়ে পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট হয়ে আসাদ গেট, কল্যাণপুর, মিরপুর-১, ২ ও ১০ হয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছাল, তখন সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট। আসন সংখ্যা ৭৫ হলেও বাসটিতে একবারে সর্বোচ্চ যাত্রী দেখা গেছে ১৫ জন।

এটি কেবল মিরপুর-মতিঝিল রুটের চিত্র নয় বরং সম্প্রতি ঢাকার যে ১০ রুটে বাসগুলো চলাচল শুরু করেছে, প্রতিটিতেই প্রায় একই চিত্র।

পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি প্রতিটি পিংক বাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার টাকা লোকসান গুনছে।

গত ১৮ আগস্ট নারী চালক ও সহকারীদের নিয়ে চালু হয় বিআরটিসির এই সেবা। তখন সরকারের পক্ষ থেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ভবিষ্যতে নারীদের চলাচল সহজ করতে এমন আরও বাস নামানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু গত এক মাসে পিংক বাস নারীদের ভোগান্তি কমাতে পারেনি।

যাত্রীরা বলছেন, দিনে নির্ধারিত রুটগুলোতে এই বাস সকালে ও বিকালে কেবল একবার যাওয়া-আসা করে। কোনো কারণে বাস মিস করলেই অন্য বাহনে চড়তে হয়।

বাংলামোটরে কর্মরত আসাদ গেটের বাসিন্দা আতিকা আক্তার বাসের অবস্থান জানতে হেলপারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছিলেন। তিনি ‘টাইমস অব বাংলাদেশকে’ বলেন, ‘বাসটি ছেড়ে আসে মিরপুর থেকে। যানজটের কারণে কখনও আসাদ গেটে আসার নির্ধারিত সময়টি ঠিক থাকে না, ২০ মিনিট পর্যন্তও এদিক-সেদিক হয়। কেউ এই বাসেই চড়তে চাইলে অপেক্ষায় থাকতে হয়। একমাত্র বাসটি মিস করলে তো শেষ পর্যন্ত সাধারণ বাসেই উঠতে বাধ্য হই।’

বাসের নিয়মিত যাত্রীদের সুবিধার জন্য ও বাসের অবস্থান জানতে অ্যাপভিত্তিক লাইভ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন তিনি।

আরেক নারী যাত্রী জানান, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুরে যাতায়াত করতে তিনি নিয়মিত প্রজাপতি বাসে চড়েন। পিংক বাসের কথা শুনলেও কখনও এতে চড়ার সুযোগ পাননি, কারণ মোহাম্মদপুর থেকে সরাসরি মিরপুর রুটে এই বাস নেই। আবার আসাদ গেট হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে তাকে বিকালে অপেক্ষা করতে হবে, অথচ তার যাতায়াত করতে হয় সকালে।

যাত্রীরা বলছেন, সীমিত রুট এবং অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়ের সঙ্গে মিল না থাকাই এই বাস সেবার বড় বাধা। অনেক নারী আবার পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে যাতায়াত করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস অনেক যাত্রার ক্ষেত্রে উপযোগী হচ্ছে না।

আরও পড়ুন

ছবি: টাইমস

 

তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার শিমু জানান তার প্রথম পিংক বাসে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। জানান, তিনি নিয়মিত ফার্মগেট থেকে কল্যাণপুর যাতায়াত করেন। তবে প্রতিদিন এই পথে চলাচল করলেও এর আগে কখনও গোলাপি বাস চলতে দেখেননি বলে জানান তিনি। সাধারণত তিনি লোকাল বাস বা রিকশায় চলাচল করেন।

শিমু বলেন, ‘পিংক বাসে ভ্রমণ করে ভালো লেগেছে। তবে এই রুটে যে এই সেবা আছে, তা জানতামই না।’

মিরপুর-১ এলাকার বিএডিসি উচ্চবিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীও দিনের শিফটের পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই বাসে ওঠে। তারা জানায়, এর আগে এই রুটে দুইবার পিংক বাস চলতে দেখলেও এবারই প্রথম নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে এই বাসে উঠেছে। ওই দুই শিক্ষার্থী জানায়, তারা মিরপুর-১০ এ নামবে। সাধারণত তারা বাবার মোটরসাইকেল, রিকশা বা লোকাল বাসে চলাচল করে।

পিংক বাস নিয়মিত চললে প্রতিদিনের যাতায়াতে এটি ব্যবহার করতে পারবে বলেও আশা করে তারা। তুলনামূলক নিরাপদ যাতায়াতের একটি সুযোগ পেয়ে তারা খুশি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান মনে করেন, নারীদের যাতায়াত আরও সহজ করার লক্ষ্যে পিংক বাস চালু হলেও পুরো উদ্যোগটিই অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর আগে যেসব কারণে নারীদের বাস সেবা ব্যর্থ হয়ে বন্ধ হয়েছে, সেই কারণগুলো বিবেচনায় রেখে মাঠপর্যায়ে যথাযথ গবেষণা বা ফিল্ড ওয়ার্ক করা উচিত ছিল।’

চতুর্থবারের পরীক্ষায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা

রাজধানীতে নারীদের জন্য আলাদা বাস সেবা চালুর এটি চতুর্থ চেষ্টা। এর আগের তিনবারও যাত্রীস্বল্পতা এবং লোকসানের মুখে পড়ে একই ধরনের উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিআরটিসি প্রথম ১৯৯৮ সালে এই সেবা চালু করে এবং ২০০১ সালে তা ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় সম্প্রসারিত করে, যা পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৯ সালে এটি পুনরায় চালু করা হলেও লোকসানের কারণে ২০১৫ সালে তা আবারও বন্ধ হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বিআরটিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘র‌্যাংগস’ যৌথভাবে ‘দোলনচাঁপা’ নামে আরেকটি বাস সেবা চালু করে, যা ২০২২ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানের এই চতুর্থ উদ্যোগটি ১০টি রুটে পরিচালিত হচ্ছে। রুটগুলো হলো- নতুন বাজার (কোকাকোলা) থেকে মতিঝিল, তালতলা থেকে মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে জিপিও, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল, মিরপুর থেকে মতিঝিল, মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল, মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল এবং বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর। ঢাকার বাইরে বগুড়ায় দুটি ও চট্টগ্রামে একটি রুট রয়েছে।

ছবি: টাইমস

নিয়মিত সাধারণ বাসযাত্রী তাহমিনা তাশরিফ ও মার্জিয়া ভূঁইয়া তাবেন্দার মতে, দ্বিতল বাসের বদলে একই খরচে বিভিন্ন রুটে একাধিক মিনিবাস চালু করার পাশাপাশি ব্যস্ত সময়ে একাধিক ট্রিপ নিশ্চিত করলে সেবাটি বেশি কার্যকর হতে পারে।

দৈনিক লোকসান

এমনিতেই আর্থিক চাপে থাকা বিআরটিসিকে আরও বাড়তি চাপে ফেলেছে এই পিংক বাস। সংস্থাটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, ১০ রুট মিলিয়ে পিংক বাসে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

গত ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি পিংক বাস মোট ৩০টি ট্রিপ পরিচালনা করে। এ সময় এক হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে মোট আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে দুই দিনে জ্বালানি, টোল ও বেতনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয় এক লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে লোকসান দাঁড়ায় এক লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা, অর্থাৎ দিনে গড়ে লোকসান হয় প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট ১২টি বাসে মোট যাত্রী হয়েছিল ৬৬৯ জন। সেপ্টেম্বরে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও আয়ের ক্ষেত্রে তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ১৩টি বাসে মোট যাত্রী সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩৫ জনে। তবে যাত্রীর বিপরীতে আয় খুব একটা বাড়েনি। গত ১৯ আগস্ট আয়ের হিসাব ছিল যাত্রীপ্রতি আয় ১৫ টাকা এবং বাসপ্রতি ৮৩৯ টাকা,  মোট আয় ছিল ১০ হাজার ৭৫ টাকা। অন্যদিকে ১৬ সেপ্টেম্বর মোট আয় হয় ১৪ হাজার ৯১৪ টাকা, যেখানে যাত্রীপ্রতি গড় আয় দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাসপ্রতি এক হাজার ১৪৭ টাকা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad