আশুলিয়ার জামগড়ায় এক শান্ত রোববারের সন্ধ্যায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায় আগুন, বিস্ফোরণ ও ছুটে আসা ধাতব খণ্ডের ভয়াবহতায়।
২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রীতি গ্রুপের এফ অ্যান্ড এফ কারখানা চত্বরে কাভার্ড ভ্যান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার আনলোড করার সময় একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরিত হয়ে পুরো শিল্প এলাকা এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। এতে অন্তত আটজন নিহত এবং ২৪ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।
এই বিস্ফোরণের তীব্রতা অত্যন্ত ব্যাপক ছিল। ধাতব খণ্ড ও ছিটকে যাওয়া স্টিলের গ্যাস সিলিন্ডার আকাশে উড়ে গিয়ে আশপাশের আবাসিক স্থাপনায় আঘাত করে। প্রায় ৫০ মিটার দূরে অবস্থিত এফএনএফ ট্রেন্ড ফ্যাশন লিমিটেডসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থাপনার জানালার কাচও ভেঙে যায়।

কারখানা চত্বরের গেটের বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় ছিটকে আসা একটি গ্যাস সিলিন্ডারের আঘাতে এক নারী পথচারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
কারখানার ভেতরে ধোঁয়া সিঁড়িঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে হাজারো শ্রমিকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নবম তলায় থাকা পোশাকশ্রমিকরা বাইরে আগুনের শিখা দেখতে পেয়ে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু নিচে এসে তারা দেখতে পান, বের হওয়ার গেটগুলোতে তালা দেওয়া।
প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে অনেকে উঁচু স্থান থেকে পাশের আঙিনায় লাফিয়ে পড়েন। এতে অনেকে হাত-পা ভেঙে এবং অন্যান্য গুরুতর আঘাতে আহত হন। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দেয় এবং ছোটাছুটি শুরু হয়।

ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ডিইপিজেড) ও জিরাবো ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিট রোববার রাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘটনাস্থলে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পায়। কাভার্ড ভ্যানের ভেতর থেকে আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া পাঁচটি দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে দফায় দফায় ২৫ জন আহতকে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে পথের অনেক দোকানি ও পরিবহনশ্রমীকরাও ছিলেন।

তবে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনার বাইরেও এ দুর্ঘটনায় শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ও সুরক্ষাজনিত নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের মর্যাদাপূর্ণ লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইনে (এলইইড) প্লাটিনাম গ্রিন সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অবৈধ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। বেশিরভাগ গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আশুলিয়ার এই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে কারখানার অফিসে পরিবেশবান্ধব সনদের স্বীকৃতি ঝুলছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানার আঙিনায় অনিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে–যার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করা শ্রমিকদের।


