ঢাকা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই (ডেসকো) এলাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের ব্যয় ৬২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণচুক্তি করতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন খাতের ব্যয় পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো)।
এর মধ্যে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বাড়ছে ৫৬৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয় বৃদ্ধির ৯০ দশমিক ১২ শতাংশ।
এ ছাড়া নির্মাণকাজের ওপর সুদ বৃদ্ধির কারণে ৯৫ কোটি ৪২ লাখ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়ায় ২ কোটি ৭২ লাখ এবং বাজারদর বৃদ্ধির কারণে ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ছে। তবে বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ ও কার্যপরিধি কমানো এবং প্রকৃত ব্যয় কম হওয়ায় ৪১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা কমছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প গ্রহণের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২৭২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৮৯৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের তুলনায় ৬২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
মূল প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন ছিল ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এডিবির ঋণ ১ হাজার ২৩১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ডেসকোর নিজস্ব অর্থায়ন ৫৯৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে সরকারের অর্থায়ন কমে ৪৪২ কোটি ১৭ লাখ টাকা হলেও এডিবির ঋণ বেড়ে ১ হাজার ৯৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডেসকোর নিজস্ব অর্থায়ন কমে দাঁড়াবে ৫০৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
ডেসকোর প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিতে বড় প্রভাব ফেলেছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। মূল প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের হিসাবের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম বিনিময় হার বিবেচনা করা হয়েছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বরের হার অনুযায়ী প্রতি মার্কিন ডলার ১২২ টাকা ৫৯ পয়সা এবং প্রতি চীনা ইউয়ান ১৭ টাকা ২৫ পয়সা ধরে হিসাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অন্যতম কারণ এডিবির ঋণচুক্তিতে বিলম্ব। ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলেও এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় প্রায় ২১ মাস পর, ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি। চুক্তিটি কার্যকর হয় একই বছরের ১ এপ্রিল।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর এডিবি ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিংয়ের প্রস্তাব দেয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ শুধু সার্বভৌম অর্থায়নের আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এডিবিকে অনুরোধ করে। অর্থায়নের ধরন নিয়ে এডিবি ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
মূল ডিপিপি অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল। এখন মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটির মোট বাস্তবায়নকাল দাঁড়াবে ছয় বছর।
ডেসকোর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় চারটি ১৩২/৩৩/১১ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র এবং চারটি ৩৩/১১ কেভি বিতরণ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। গ্রিড উপকেন্দ্রগুলো হবে বিমানবন্দর, কালশি, বসুন্ধরা ও টঙ্গীতে। বিতরণ উপকেন্দ্র হবে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোন, মিরপুর, টঙ্গী ও পূর্বাচলে।
এ ছাড়া ২৭ কিলোমিটার ডাবল সার্কিট ১৩২ কেভি ভূগর্ভস্থ সঞ্চালন লাইন, ৫০ সার্কিট কিলোমিটার ৩৩ কেভি এবং ১০০ কিলোমিটার ১১ কেভি ভূগর্ভস্থ ক্যাবল লাইন এবং ১৫০ কিলোমিটার ১১/দশমিক ৪ কেভি ওভারহেড বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হবে।
ডেসকোর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডেসকো এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ সক্ষমতা ৫৯৫ এমভিএ বাড়বে। পাশাপাশি দুই লাখ নতুন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া এবং এক লাখ বিদ্যমান গ্রাহককে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া ডেসকোর সিস্টেম লস ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ প্রকল্পটি সংশোধনের সুপারিশ করে বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ডেসকো এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে। এতে ঢাকার ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে এবং নতুন গ্রাহকদের সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান গ্রাহকদের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


