নেত্রকোনার মদনে ১১ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার আসামি মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার দুপুরের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে এদিন ভোরে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৪।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাদ্রসাছাত্রী ধর্ষণ মামলার আসামিকে র্যাব গ্রেপ্তার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি জানান, আদালতে আসামির সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে রিমান্ড শুনানি হবে।
এদিকে বুধবার দুপুর র্যাব-১৪ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানায়, মামলা হওয়ার পর থেকেই শিক্ষক আমান উল্লাহ গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান। র্যাব এই চাঞ্চল্যকর মামলার ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সোনামপুর এলাকা থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামি আমান উল্লাহ মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহাড় বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে। তিনি ওই গ্রামের হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, আমান উল্লাহ মদন উপজেলার পাঁচাহাড় গ্রামে ২০২২ সালে হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসাতে তার স্ত্রীও শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। ওই মাদ্রাসায় আশপাশের এলাকার মেয়েরা লেখাপড়া করে। ভুক্তভোগী শিশুটিও একই এলাকার বাসিন্দা। শিশুটির বাবা তাদের ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরুদ্দেশ। জীবিকার তাগিদে ১১ বছর বয়সী ওই শিশুর মা সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করত।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার পর শিক্ষক আমান উল্লাহের আদেশে ভুক্তভোগী শিশুটি ঝাড়ু দিয়ে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদের বারান্দা পরিষ্কার করতে থাকে। সেই মুহূর্তে ওই শিক্ষক শিশুটিকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন। এতে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং বিষয়টি পরিবার টের পাওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে মাদ্রাসা শিক্ষকের নাম উঠে আসে। পরে শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তা সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী শিশুটির মা গত ২৩ এপ্রিল মদন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিক্ষক আমান উল্লাহকে অভিযুক্ত করে একটি ধর্ষণ মামলা করেন। মামলার ১৩ দিন পর শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় র্যাব।
অন্যদিকে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমান উল্লাহর আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও বার্তায় আমান উল্লাহ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, শিশুটিকে অন্য কেউ ধর্ষণ করে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের আইনের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল জানিয়ে বলেন, ‘তদন্ত এবং মেডিকেল রিপোর্টে আমি দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি মাথা পেতে নেব।’
মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা চিকিৎসক সায়মা আক্তারের সঙ্গে বুধবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি। তার মোবাইলে তার স্বামী মো. আসিফুল ইসলাম ইসলাম বলেন, ‘মাদ্রসাছাত্রী ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে আমরা খুব চাপের মুখে আছি। অপরিচিত নম্বর থেকে আমার স্ত্রীকে একাধিকবার ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।’
মাদ্রাসাছাত্রীর নানা বলেন, ‘আমার নাতনির সঙ্গে খুবই খারাপ ঘটনা ঘটেছে। হুজুরকে আমরা খুব সম্মান করতাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার নাতনি তার মায়ের সঙ্গে ভালো আছে। এ ব্যাপারে আমরা কোনো ফয়সালা মানি না। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি। আমরা চাই সুষ্ঠু বিচার হোক। অপরাধীর কঠিন বিচার করা হোক।’
মদনের কাইটাইল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সোহেল রানা বলেন, ‘মেয়ে পক্ষ বলছে মাদ্রাসার হুজুরের কথা, আবার ধর্ষণের বিষয়টি হুজুর অস্বীকার করছেন। আমরা এলাকাবাসী চাই ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসুক। অপরাধীর কঠিন বিচার হোক এটাই আমাদের চাওয়া।’


