রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা হিসেবে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) পথ হারিয়েছে। প্রতিষ্ঠার সময়ই এর লক্ষ্য ছিল নগরবাসীকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহন সেবা দেওয়া। কিন্তুসেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে এখন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে বাস।
পর্যাপ্ত সংখ্যক বাসের অভাবে রাজধানীবাসীর যাতায়াত যেখানে কঠিন হয়ে উঠেছে, সে সময় যাত্রী পরিবহনের বদলে অফিসগামীদের আনা নেওয়ার কাজেই নিয়োজিত বিআরটিসির বহরের একটি বড় অংশ।
বিআরটিসির বাসের আয়ু এমনিতেই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম, কখনো কখনো তা এক তৃতীয়াংশেরও কম। বর্তমানে সারা দেশে কোম্পানিটির সচল বাসের সংখ্যা এক হাজার ১৫০টি। এর প্রায় ৭০ শতাংশ চলে ঢাকায়। কিন্তু ঢাকাবাসী এর সুবিধা পায় কমই।
রাজধানীর প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য রাস্তায় নিয়মিত চলাচল করছে মাত্র ৭০টি বিআরটিসি বাস। বিপরীতে সংস্থাটির প্রায় ৪৫০টি বাস বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘স্টাফ বাস’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
কলেজ শিক্ষক মো. হাশেম উদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিআরটিসিতে উঠতে গেলেই দেখি এই স্টিকার, ওই স্টিকার। সব যদি ভাড়ায় দিয়া দেয় তাইলে আমরা সাধারণরা মানুষ চড়ব কীসে?’
আরেকযাত্রী আকলিমা বেগম বলেন, ‘বিআরটিসি তো এমন ছিল না। এখন নানা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়া রাখে, আমাদের তো উঠতে দেয় না। উঠতে গেলে খারাপ ব্যাবহার করে। মারমুখী হয়ে তেড়ে আসে।’
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা দাবি করেন, অনেক রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় বাস খালি চলে। এতে তেলের খরচও ওঠে না।
আর্থিক চাপের যুক্তি দেখিয়েই বিআরটিসি সাধারণ যাত্রী পরিবহন কমিয়ে ‘স্টাফ বাস’ মডেলের দিকে ঝোঁকার কথা জানানআরেক কর্মকর্তা। তিনি সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে বলেন, গত জানুয়ারিতে লোকসানি বাসের সংখ্যা ছিল ৪৫টি, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে।
বেসরকারি কোম্পানিগুলো মুনাফার কারণে নিয়মিত বাসের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। সেখানে বিআরটিসি কেন লোকসান দেবে-এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) রাহেনুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘বেসরকারি পরিবহন মালিকরা কোথায় বাস দিলে বেশি লাভ হবে, সেটাই আগে বিবেচনা করেন। কিন্তু বিআরটিসির দায়িত্ব শুধু লাভ করা না, জনসেবাও নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সময় রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক বিবেচনায়ও রুট পরিচালনা করতে হয়’।
প্রয়োজন যাচাই না করেই কিছু বাস কেনা, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, ক্রয় ও মেরামত প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতার কথাও বলেন তিনি।
জনবল সংকটের কারণে একটি বাস থেকে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক ট্রিপ পাওয়া যায় না জানিয়ে বিআরটিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অনেক ডিপোতে পর্যাপ্ত মেকানিক নেই, দক্ষ চালকের ঘাটতি আছে। আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও ক্রয় প্রক্রিয়া তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন। তারপরও আমরা ধাপে ধাপে অপারেশনাল শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
সরকারের চোখে বিআরটিসির দুর্বলতা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (পিআইএস) ২০২৫-এর প্রতিবেদনেও ওঠে এসেছে বিআরটিসির দুর্বলতা।
এতে উল্লেখ করা হয়, বিআরটিসি এখনও অনেকাংশে পুরোনো ‘ফিক্সড রুট’ মডেলে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে যাত্রী চাহিদার চেয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যেসব রুটে যাত্রী ও আয় বেশি, সেখানে পর্যাপ্ত বাস দেওয়া হয় না। আবার কম চাহিদাসম্পন্ন রুটে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বাস চলাচল করে। এতে অনেক সময় ফাঁকা বাস চালাতে হয়, যা করপোরেশনের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গণরিবহন বিশেষজ্ঞ শাসমুল হক টাইমসকে বলেন, সুষ্ঠু রুট পরিকল্পনা, কার্যকর ট্রিপ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট থাকলে একই বহর দিয়েও অনেক বেশি জনসেবা দেওয়া সম্ভব ছিল। তাতেসংস্থার আয়ও বাড়ত।
আরেক পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামানের মতে, বিআরটিসির স্টাফ বাসনির্ভর মডেল জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তার ভাষায়, ‘রাষ্ট্রীয় এই বাসগুলো কেনা হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্য। এখন সেগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সেবায় ব্যবহার হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও রাষ্ট্রীয় গণপরিবহনের মূল কাঠামো এমন নয়।’
তিনি আরও বলেন, বিআরটিসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করা।
একই ধরনের মত দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা যদি নিজেই গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে পুরো নগর পরিবহন ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।’
আর যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হকের ভাষায়, ‘গণপরিবহন একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি খাত। অথচ এখানে দক্ষ নেতৃত্ব ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ঘাটতি দীর্ঘদিনের। অর্থাৎ সংকটটি কেবল বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ফল।’
নিজের নীতিমালা নিজেই মানে না বিআরটিসি
সংস্থাটির নীতিমালায় বলা আছে, স্টাফ বাস হিসেবে ব্যবহার করা বাসগুলো অফিস সময় শেষে আবার সাধারণ যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ বাস ডিপোতে ফিরে যায় অথবা সীমিত পরিসরে চলাচল করে।
স্টাফ বাস পরিচালনাতেও রয়েছে নানা অসঙ্গতির অভিযোগ। কিছু ডিপো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাস চালায় না। কোথাও চুক্তি অনুযায়ী শুধু নির্ধারিত যাত্রী পরিবহনের কথা থাকলেও বাস্তবে ফেরার পথে লোকাল বাসের মতো যাত্রী তোলা হয়। এমনকি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও আছে।
স্টাফ বাস মডেলে বিআরটিসি এতটাই ঝুঁকেছে যে, মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া বাসও কাজে লাগানো হচ্ছে। অর্থাৎ পুরনো বাস সড়ক থেকে তুলে দেওয়ার সরকারি নির্দেশ সরকারি সংস্থা হয়েও অমান্য করছে বিআরটিসি।
চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে কেনা বহু বাস ইতোমধ্যে আয়ুষ্কাল হারিয়েছে। পরে সেগুলো গাজীপুরের কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় নিয়ে সংস্কার করে আবার রাস্তায় নামানো হয়েছে।
বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা এটিকে ‘রাজস্ব সাশ্রয়’ হিসেবে দেখছেন। তার দাবি, নতুন গাড়ি কেনার বদলে পুরোনো বাস মেরামত করায় সরকারের অর্থ বাঁচছে।
কিন্তু এই মডেলে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি সামনে এনে এর সমালোচনা করেনশামসুল হক। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া পুরোনো বাস সংস্কার করে দীর্ঘদিন সড়কে চালানো শুধু আর্থিক ঝুঁকিই বাড়ায় না, পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।’
তিনি বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ বাসগুলো সাধারণত বেশি জ্বালানি খরচ করে এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গত করে। ফলে একদিকে যেমন পরিচালন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে নগরীর বায়ুদূষণও তীব্র হয়।’
তার মতে, স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব সাশ্রয়ের যুক্তিতে পুরোনো বাস সচল রাখার বদলে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বহর গড়ে তোলার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।


