মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর মৃতের ‘সরকারি সংখ্যা’ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। সর্বশেষ ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সংশোধিত বিবৃতি আগের বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতি প্রকাশ করেছে।
এই সংখ্যা ওঠানামা জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং পুলিশ, চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রোববার প্রকাশিত নতুন একটি সরকারি তালিকায় মৃতের সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ৩৪ জন দেখানো হয়। এ পরিবর্তন ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শনিবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে ৩৫ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তারা সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয় ৩৪ জন, যা সরকারের দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। শুরু থেকেই সামাজিক মাধ্যমে মৃতের সংখ্যা নিয়ে নানা সন্দেহের কথা বলা হচ্ছিল। এ ধরণের তথ্যবিভ্রাট সে সব সন্দেহকে বাড়িয়ে দেয়।

এদিকে, রোববার সিএমএইচ থেকে আলাদা এক বিবৃতিতে পুলিশের করা আগের মরদেহ গণনায় অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
সিএমএইচ জানায়, ২১ জুলাই তারা মোট ১৫টি মৃতদেহ ব্যাগ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল ১১টি সম্পূর্ণ মৃতদেহ, ২টি অপূর্ণ মৃতদেহ এবং ৫টি দেহাবশেষের সেট।
তুরাগ থানা পুলিশ ওই ১১টি সম্পূর্ণ মৃতদেহকে প্রথমে পৃথক ব্যক্তি হিসেবেই নথিভুক্ত করে। কিন্তু এর মধ্যে ৯টি পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনরা দাবি করে। ২১ জুলাই ৮টি মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়, অপরটি ২২ জুলাই হস্তান্তর করা হয়।
২টি অচিহ্নিত মৃতদেহ, ২টি অপূর্ণ দেহ এবং ৫টি দেহাবশেষের সেট ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-এর কাছে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২২ জুলাই স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়।
ডিএনএ পরীক্ষার পর সিআইডি নিশ্চিত করে যে এই দেহাবশেষগুলো আরও ৫ জনের অন্তর্ভুক্ত।
তুরাগ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাই রাতেই এগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, আগের বেশি সংখ্যক মৃত্যুর হিসাব আসলে ডুপ্লিকেট গণনার ফল, যেখানে দেহাবশেষগুলিকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে ভুলভাবে গণ্য করা হয়েছিল।
শনিবার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনায় আহত দুই ছাত্র আয়ান খান ও রাফসি (দুজনেই ১২ বছর বয়সী) সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
“তারা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছে এবং দুপুরের দিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়,” সংবাদ সম্মেলনে বলেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন।
তবে একই দিনে আসে আরেকটি দুঃসংবাদ। মারাত্মক দগ্ধ হওয়া মাসুমা বেগম (৩৬) ও জারিফ ফারহান (১৩) শনিবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন।
শনিবার বিকাল পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ৩৬ জন রোগী।
ডা.নাসির বলেন, ‘চারজন আইসিইউতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে, নয়জন সিবিআর ইউনিটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে এবং বাকি রোগীরা সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।’
তিনি আরও জানান, শারীরিক উন্নতির ওপর ভিত্তি করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও অন্তত ১০ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে ২১ জুলাই দুপুর ১টার কিছু পর, যখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিগিআই যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি অংশে বিধ্বস্ত হয়। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বহু ছাত্র-শিক্ষক আহত হন।
দুর্ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি বা পাইলটের ভুল সম্ভাবনার কথা উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে সামরিক ফ্লাইটপথ থাকা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি উঠেছে।


