ঢাকার একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার দুই দশক পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সব আসামির খালাসের ফলে তৈরি হয়েছে এক গভীর বিচারিক শূন্যতা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ সব আসামি খালাসের হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়নি।
ফলে ২১ আগস্টের দিনে আবারও সামনে এসেছে একটি বড় প্রশ্ন—যে বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে বিতর্কিত ছিল, তা শেষ হওয়ার পর ২৪ নিহত এবং শতাধিক আহত মানুষের জন্য ন্যায়বিচার কোথায়?
আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বেঞ্চ, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে, ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। রায়টি কিছু পর্যবেক্ষণসহ দেওয়া হয়, যেখানে হাইকোর্টের রায়ের কিছু অংশ সংশোধন ও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—২৪ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী কারা এবং তাদের বিচারের জন্য নতুন কোনো আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না।
প্রাণ হারান ২৪ জন
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
এই ঘটনায় দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়। পরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিলের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩১ অক্টোবর হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি শুরু হয়।
১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট জানায়, সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচার অবৈধ ও বাতিল।
এরপর মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন আবেদন বাতিল করে এবং আসামিদের আপিল গ্রহণ করে তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেন হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেন।
পুনঃতদন্ত থেকে দ্বিতীয় অভিযোগপত্র
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, মামলাটির বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিআইডির কর্মকর্তা ফজলুর করিম প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচার শুরু হয়েছিল।
তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি পুনঃতদন্তে দেওয়া হয়, যা চলে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত।
পরে দ্বিতীয় অভিযোগপত্রে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের—তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ—অনেককে আসামি করা হয়।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দ্বিতীয় তদন্তের মাধ্যমে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া এবং সেই ভিত্তিতে বিচার শুরু করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।’
তিনি দাবি করেন, অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। তার ভাষায়, ‘মিথ্যা কখনো প্রমাণিত হয় না। ন্যায়বিচারের আদালতে, সত্যের আদালতে তারা বেকসুর খালাস পেয়েছেন হাইকোর্ট থেকে। আপিল বিভাগেও হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখা হয়েছে।’
বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ শুধু তদন্ত বা অভিযোগপত্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিচার কার্যক্রম এবং বিচারকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই মামলায় যখনই সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, নিম্ন আদালতের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন সকাল-বিকাল খারাপ আচরণ করতেন।’
তার অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান উচ্চস্বরে কথা বলতেন এবং আদালতের করিডোর পুরোপুরি পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করত, ফলে আসামিপক্ষের জেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান প্রায় একই সময়ে আদালতে আসতেন এবং বিচারকের খাস কামরায় প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করতেন।
মোহাম্মদ আলীর মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন না হলে বিএনপির নেতারা এই খালাস পেতেন না। তিনি বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগও করেন।
‘বিচার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে’
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এস এম শাহজাহান মনে করেন, তদন্তের ত্রুটিই খালাসের প্রধান কারণ।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালের প্রথম অভিযোগপত্রের পর ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার গতিপথ বদলে যায়।
তার ভাষায়, ‘তদন্তের ত্রুটিই এই মামলায় খালাসের প্রধান কারণ।’
তিনি বলেন, বিচার বিভাগ ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
‘বিচারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। ন্যায়বিচারের নদীকে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে দিতে হবে,’ বলেন তিনি।
তার মতে, কোনো শাসক, সরকার, রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক স্বার্থ যদি বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে, তাহলে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ আলীও বলেন, যেকোনো ঘটনার পর তদন্ত অবশ্যই রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘তদন্ত নিরপেক্ষ হতে হবে। তাহলেই প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।’
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকলে বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থাগুলো অতীতেও জটিল অনেক ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করেছে। তবে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে।
তাদের মতে, দ্বিতীয় তদন্তের মাধ্যমে মামলার স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং বিএনপির নেতাদের সম্পৃক্ত করার পর শেষ পর্যন্ত সব আসামিই খালাস পেয়েছেন।
খালাসের পরও রয়ে গেছে প্রশ্ন
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে আসামিরা খালাস পেয়েছেন, যা এখন আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে।
তবে এই খালাসের অর্থ এই নয় যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হামলার ঘটনা ঘটেনি।
২৪ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা এই মামলার বিচারিক ইতিহাসের মূল বিষয় হয়ে থাকবে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো—যে বিচার প্রক্রিয়ায় একসময় সাজা দেওয়া হয়েছিল, পরে যা অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে প্রকৃত হামলাকারীদের বিচারের পথ কী?
আইনজীবীরা বলছেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা আরও পরিষ্কার হতে পারে।


