খামারিদের লিটারে ৩ টাকা বেশি দিয়ে মিল্কভিটা বাড়াল ১০ টাকা

খামারিদের লিটারে ৩ টাকা বেশি দিয়ে মিল্কভিটা বাড়াল ১০ টাকা
Advertisement
Advertisement

সংবাদকর্মী এ এস এম রেজা তার মেয়েকে বরাবর মিল্কভিটার দুধ পান করান। গত বুধবার সকালে তিনি দুধ কিনতে গিয়ে গিয়ে দেখেন দাম ১০ টাকা বেড়ে গেছে। এক লিটারের দাম ১০০ টাকার থেকে ১১০ টাকা হয়ে গেছে।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘তার দুই দিন আগেই তো ১০০ টাকা করে নিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হুট করে কেন দাম বাড়ল? তারা বলে কোম্পানি বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আমার তো মেয়েকে খাওয়াতেই হবে। কী আর করা?’

সরকারি প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বা গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে থাকে। তবে মিল্কভিটার কোনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটেও এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি নেই।

পরে যোগাযোগ করা হলে মিল্কভিটা সমিতি বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক অমিয় কুমার মণ্ডল দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

দাম বাড়ানোর কারণ কী-এমন প্রশ্নের ব্যাখ্যা সরকারি প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। একজন আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। পরে ঘুরে ফিরে অমিয়র কাছেই আসতে হয়, যিনি নিজেকে ‘ছোট কর্মকর্তা’ দাবি করে এ নিয়ে আগেই মন্তব্য করবেন না বলে জানিয়েছেন।

তবে এর ফাঁকে জানা গেল, বিক্রয়মূল্য ১০ টাকা বাড়ালেও সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি ক্রয়মূল্য, অর্থাৎ খামারিদেরকে বাড়তি দেবে তিন টাকা।

অমিয় কুমার মণ্ডলের কাছে প্রশ্ন ছিল ৩ টাকা বাড়ানোর পর ক্রয়মূল্য কত হয়েছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্রয়মূল্য তো মানের ওপর নির্ভর করে। আমরা ৪৩ টাকা থেকে ১০৩ টাকা পর্যন্ত কিনি।’তাতে গড় কত হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘৬২ টাকা।’

৬২ টাকা ক্রয়মূল্য হলে বিক্রয়মূল্য ১১০ টাকা, এটা অতি মুনাফা হয়ে গেল কি না, এই প্রশ্নে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলাম দপ্তরে কল করা হলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শাহরিয়ার ফেরদৌস ভূঞা বলেন, ‘এমডি স্যার এখন ছুটিতে আছেন। আপনাকে কথা বলতে হলে রোববার কথা বলতে হবে।’

আরও পড়ুন

পরে প্রধান কার্যালয়ের অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক ফিরোজ আহমেদ খানকে কল করলে তিনি ফের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন। সেই বিভাগেই কাজ করেন অমিয়, যিনি এর আগে কথা বলতে রাজি হননি।

তবে এই কর্মকর্তা যে ১০৩ টাকা দর পর্যন্ত দুধ কেনার কথা বলেছেন, সেই তথ্যে দুইজন খামারি অবাক হয়েছেন।

পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার চৌবাড়ীয়া হারোপাড়া গ্রামের খামারি মোস্তাক আহম্মেদ টাইমসকে বলেন, ‘একেক সময় একেক দাম দেয়।’সেটা কত? বলেন, ‘৪০, ৪৫ ও কখনো ৫০ টাকা।’

তিনি জানান ক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকরা খামারিদেরকে অগ্রিম টাকা দেন। দুধ দেওয়ার সময় সেই টাকার অনুপাতে দাম উঠানামা করে।

ভাঙ্গুড়ারই আরেক খামারি লিটন আহমেদ জানালেন তিনি সবশেষ ৫১ টাকা দরে দুধ দিয়েছেন। তিনি জানান, দুধের দামে বাইরে পরিবহন ব্যয় ও কমিশন দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি ৮ কিলোমিটার দূর থেকে আসি, আমাকে লিটারে ১ টাকা ৮৮ পয়সা করে দেয়। আর কমিশন দেয় ১ টাকা। যাদের দূরত্ব আরও বেশি, তারা বেশি পায়, তবে সেটি কত, তা জানি না।’

লিটন নিজে দুধ দেন আবার দুধ সংগ্রহের ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করেন। ব্যবস্থাপকরা আবার খামারিদেরকে দাদন দেন। তার নিজের ১০টা গাভি আছে, তবে তার অধীনে ৬৫ জন সদস্য আছে।

তিনি বলেন, ‘আমার ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পড়ে আছে। টাকা নিয়ে চলে গেছে অনেকে। সেই হিসেবে কমিশন হিসেবে আমাদের অল্প কিছু লাভ থাকে।’

মুনাফা কি বেশি করছে মিল্কভিটা

গড় ক্রয় মূল্য যেখানে ৬২ টাকা, সেখানে বিক্রয়মূল্য ১১০ টাকা বেশি হয়ে যায় কি না, এই প্রশ্নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এটা তো বেশিই মনে হয়। কারণ, দুধ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে চিলিং, প্যাকেজিং আর পরিবহন ছাড়া তো কোনো খরচ নেই। আবার দুধ থেকে উপজাতও তৈরি করে মিল্কভিটা। গ্রামে তো ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় দুধ পাওয়া যায়, উপজেলাতেও তো ৭০ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এখানে অনেক কারসাজি থাকে। সেটা পুষিয়ে নিতে দাম বাড়াল কি না সেটা জানি না।’

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট-বিএলআরআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘তারা তো ক্রয়মূল্যের দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম রাখছে। এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক। তা ছাড়া মিল্কভিটার মূল উদ্দেশ্য তো মুনাফা করা না, সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখা। তারা যখন দাম বাড়ায়, তখন অন্য প্রতিষ্ঠানও বাড়াতে থাকে। এটা তো ভোক্তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে।’

বেসরকারি কোম্পানি, যাদের কাছে মুনাফাই প্রধান উদ্দেশ্য, তারা যেখানে দাম বাড়ায়নি, সেখানে সরকারের সংস্থাই কেন এই পথে হাঁটল, সেই প্রশ্নও তুলছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে মানুষ। সরকার চেষ্টা করছে কীভাবে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যায়। মিল্কভিটার উচিত ছিল সরকারের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য দাম কতটা কম রাখা যায় সেটি বিবেচনা করা। সেখানে তারা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেওয়ার কাজ করল। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad