রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেপরোয়া আম্মারের রাজত্ব

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেপরোয়া আম্মারের রাজত্ব
কার্টুন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও উগ্র আচরণে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উপাচার্য থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী–সবাই এখন তার বেপরোয়া ব্যবহারে ত্যক্ত-বিরক্ত ও শঙ্কিত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে পরিচিতি পান আম্মার। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পোষ্য কোটা’ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হন। কিন্তু রাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বদলে যেতে থাকে তার আচরণ।

গত ডিসেম্বরে এক ঘটনার পর তৎকালীন উপ-উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন খান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আম্মারের উগ্র আচরণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার বিব্রত ও ভীত।’

সম্প্রতি ‘ছাত্রলীগ’ তকমা দিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আম্মার শিক্ষার্থী প্রতিনিধি তো দূরের কথা, সাধারণ শিক্ষার্থীর আচরণও করছেন না। লাইব্রেরিতে ঢুকে শিক্ষার্থীদের পেটানোর অপরাধে তার জেলে থাকার কথা। আমরা তার কঠোর শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আম্মার কোনো অনুশোচনা প্রকাশ না করে উল্টো মন্তব্য করেন, ‘দেশের বিচারব্যবস্থা ঠিকঠাক চললে আমার মনে হয় না এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে।’

বেলচা হাতে তাণ্ডব

অতিসম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আম্মারকে এক শিক্ষার্থীর দিকে বেলচা হাতে তেড়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীকে ‘মাটিতে পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেন।

ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি লাঠিসোঁটা নিয়ে লাইব্রেরির পাঠকক্ষে ঢুকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটাচ্ছেন। পরে জানা যায়, একটি প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে প্রক্টর দপ্তরে মীমাংসার বৈঠক চলছিল। সেখানে মো. আনাস নামের এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে প্রক্টরের সামনেই চড়-থাপ্পড় মারেন আম্মার ও রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির। আনাসের মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার ছবি দেখে তার ওপর এই হামলা চালানো হয়।

পরবর্তীতে আনাস ও তার সঙ্গীরা লাইব্রেরির পাঠকক্ষে আশ্রয় নিলে আম্মার এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা রড, বাঁশ ও বেল্ট নিয়ে সেখানে চড়াও হন। হামলায় গুরুতর আহত হন আনাস, মাহমুদুল ও হাসিব নামের তিন শিক্ষার্থী। এমনকি তাদের রক্ষা করতে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীরাও মারধরের শিকার হন। আহত মাহমুদুলকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাকে টানাটানি ও লাথি মারে হামলাকারীরা।

আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে আম্মারের স্পষ্ট জবাব, ‘আমরা মার খাইনি, মার দিয়েছি। প্রশাসনের ওপর ভরসা রেখে লাভ নেই।’

আরও পড়ুন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছে। সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আগের যত বিতর্কের খতিয়ান

আম্মারের উগ্র আচরণ কিংবা আইন হাতে তুলে নেওয়া এবারই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি একাধিক বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়েছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে ছয়জন ডিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লেখান এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ডিন অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন তিনি। এ ছাড়া উপাচার্যের কাছে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের তালিকা দিয়ে তাদের ধরে থানায় সোপর্দ করার হুমকিও দেন।

তার বিরুদ্ধে উপ-উপাচার্য মাঈন উদ্দীনকে লাঞ্ছিত করা এবং একজন উপ-রেজিস্ট্রারের দাড়ি ধরে টানাটানির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অন্য একটি হলের ছাত্র সংসদের জিএসকে কলার ধরে হেনস্তা করার অভিযোগও আছে।

রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে টাঙানো একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে সেই ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করেন আম্মার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষকরা উপাচার্যের কাছে তার মানসিক চিকিৎসার দাবি পর্যন্ত তুলেছিলেন।

ব্যক্তিগত আচরণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিযোগ কম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক নারী নেত্রীর ফেসবুক পোস্টে আপত্তিকর মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। আবার ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠান তিনি, যাকে চাঁদা দাবি হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে সেটির আর্থিক হিসাব প্রকাশ করার কথা বললেও তিনি তা দেননি।

মাসুদ হত্যায় ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আবদুল্লাহ আল মাসুদ নামে প্রাক্তন এক ছাত্রলীগ নেতাকে চটের বস্তায় ভরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মাসুদের মৃতদেহ থানায় আনা হলে সেখানে আম্মারকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। যদিও আম্মারের দাবি, তিনি অন্য কাজে থানায় গিয়েছিলেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

২০১৪ সালে মাসুদের ওপর হামলা চালিয়ে তার এক পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে বলে ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে তিনি পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছিলেন।

রাজনৈতিক পরিচয় ও পেশিশক্তির মহড়া

ছাত্রশিবির পরিচালিত তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা আম্মার নিজেকে ফেসবুকে ‘জীবন্ত গাজী’ বলে দাবি করেন। তার পরিবারের সদস্যরাও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জড়িত। শিবিরবান্ধব পরিবেশে বেড়ে উঠলেও সাংগঠনিকভাবে পদে ছিলেন না বলে দাবি করেন আম্মার।

ক্যাম্পাসের ছাত্র নেতারা বলছেন, রাকসু নির্বাচনের সময় আম্মারের এই বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন তিনি শিবিরের ‘প্রক্সি’ হিসেবে ক্যাম্পাসে সহিংস রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আম্মার ক্যাম্পাসে পেশিশক্তির মহড়া দিচ্ছেন, যা অতীত সহিংস ছাত্ররাজনীতিরই ইঙ্গিত দেয়।’

ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ অভিযোগ করেন, ‘শিবির নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে সরাসরি মাঠে না নেমে আম্মারকে দিয়ে এসব বিতর্কিত ও উগ্র কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad