গভীর রাতে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বলেছে, ‘কোনো আন্দোলনকারীকে একা করে ফেলা হবে না। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি।’
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সিজেপি অভিযোগ করে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা ভঙ্গ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে দলটি নতুন করে আন্দোলনে ফেরার হুঁশিয়ারিও দেয়।
সিজেপির দাবি, বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তারা বিহার ও আসাম সরকারের জারি করা এমন প্রজ্ঞাপনের কপি তাদের দেখিয়েছেন, যেখানে আন্দোলনকারীদের জন্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি রাজ্য থেকে প্রজ্ঞাপন (নোটিফিকেশন) জারি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছে সরকার।
সোমবার রাত ১টার দিকে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, সরকার আবারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি/এনডিএ-শাসিত অন্য রাজ্যগুলোও একই ধরনের সুরক্ষামূলক প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
সৌরভ দাস লিখেছেন, ‘আমাদের সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টা পর সরকারি প্রতিনিধিরা আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকটি দুই থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তারা বিহার ও আসাম সরকারের সেই প্রজ্ঞাপনের কপি আমাদের দেখিয়েছেন, যেখানে এফআইআর প্রত্যাহার, ভবিষ্যতে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং আটক ও গ্রেপ্তার হওয়া সবাইকে মুক্তি দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, সমঝোতায় যে ভাষা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিই ব্যবহার করা হবে। কোনো আন্দোলনকারীকে একা ফেলে রাখা হবে না। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি।’
এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই সিজেপি জানিয়েছিল, আন্দোলনকারীদের সুরক্ষার প্রশ্নে তারা আবারও রাজপথে নামতে পারে।
গত মে মাসে ভারতের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা (নিট) এবং সরকারি চাকরির কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠে কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে।
এর পরপরই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি মামলার শুনানির সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করেন।
তার এই মন্তব্য ঘিরে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অনলাইনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের বহু তরুণ প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তেলাপোকাকে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে বেছে নেন।
এর জেরে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে। কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
সামাজিকমাধ্যমে ‘উই আর ককরোচেস’ নামে হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করছেন।
সংগঠনের সমর্থকেরা বেকারত্ব, সীমিত চাকরির সুযোগ এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে মোদি সরকারকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গচিত্র, রসাত্মক নির্বাচনী স্লোগান ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রকাশ করতে থাকেন। অনুসারীদের পাশে অবস্থান করতে গত জুন মাসে অভিজিৎ দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন। এরপর তার নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটি রাজপথে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
মূলত শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন করে প্রাণ পায় ভারতের লাদাখের বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থন পাওয়ার পর। তিনি সিজেপি এবং বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকাল অনশন শুরু করলে সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্র সরকারের আশ্বাসের পর ২৬ দিনের অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এক ভিডিও বার্তায় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে শনিবার ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর গত সপ্তাহান্তে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ৩৭ দিনের আন্দোলন শেষ করে সংগঠনটি।
এরপর সোমবার সিজেপির মুখপাত্র অশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আশ্বাস দেওয়া হলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা এখনো পুলিশি হয়রানির মুখে পড়ছেন।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে হওয়া সমঝোতা পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দিল্লি ও অন্য রাজ্যগুলোতেও আন্দোলনকারীদের নজরদারি ও হয়রানি করা হচ্ছে। দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের আটকেরও একাধিক খবর পাওয়া যাচ্ছে।’
রাঙ্কা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং সতর্ক করে বলেন, সমঝোতা বাস্তবায়ন না হলে তারা আবারও আন্দোলনে বসতে বাধ্য হবেন।
এরপরই সিজেপির সঙ্গে বৈঠকে বসে সরকার। বৈঠকের পর সৌরভ দাস জানান, রাজস্থান নিয়েও তারা নতুন আশ্বাস পেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বিহার ও আসামের প্রজ্ঞাপনের পর এখনই আমরা এই নিশ্চয়তা পেয়েছি যে রাজস্থানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেবে না। সেখানে কোনো এফআইআর দায়ের হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না।’


