গত দুই দশক ধরে জাল টাকা তৈরির অভিযোগে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন লিয়াকত হোসেন জাকির। কিন্তু প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও জড়িয়ে পড়েছেন একই অপরাধে। ‘মাজার জাকির’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তিকে এখন আবারও খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ জানায়, জাকির দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকার কারবারে জড়িত। তিনি কেবল জাল টাকা তৈরিই করেন না, বরং অন্যদের কাছে জাল টাকা ছাপানোর প্রযুক্তি বিক্রি করেন এবং এই কাজে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। ২০২৪ সালের জুন মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে তৃতীয়বারের মতো গ্রেপ্তার করেছিল।
পুলিশের মতে, সাধারণত ঈদসহ বড় বড় উৎসবের আগে দেশে যখন নগদ টাকার লেনদেন বেড়ে যায়, তখন জাল টাকার সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জাল টাকা চক্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। গত বুধবার রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার রবিউল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই এর আগেও একই ধরনের অপরাধে ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর তারা আবারও পুরনো পেশায় ফিরে যান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, দুর্বল তথ্য-প্রমাণ এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে জাল টাকার মামলায় অপরাধীদের সাজা হওয়ার হার খুবই কম। এ ছাড়া লিয়াকতের মতো অনেক সন্দেহভাজন জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং সেখান থেকেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যান।
সিআইডি এবং ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে বেশ কয়েকটি সংগঠিত চক্র জাল টাকা তৈরি ও বিতরণে সক্রিয় রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জাল টাকার কারবারিরা এখন ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে এবং অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে সাধারণ মানুষকে এই পথে প্রলুব্ধ করছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে জাল টাকার এই বিস্তার অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সংকটের সময়ে জাল মুদ্রা বাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে জাল টাকা সংক্রান্ত প্রায় সাড়ে সাত হাজার মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালে যোগ হয়েছে আরও ১০০টির বেশি মামলা, আর গত চার মাসেই অন্তত ২৩টি মামলা রেকর্ড করা হয়। শুধু ঢাকাতেই ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় ৭০০টির বেশি মামলা হয়েছে।
নথিপত্র বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীতে ২৮টি মামলা বিচারাধীন ছিল। ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দুই হাজার ৪৮৬টি নতুন মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭৭টির। তবে মামলা নিষ্পত্তি মানেই সাজা নয়; বরং প্রমাণের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়ে যান।
বর্তমানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মিরপুর, সদরঘাট, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ এবং ভোলার মতো এলাকাগুলোতে জাল টাকার সক্রিয় চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। জাকির, হুমায়ুন ও কাউসারের মতো ব্যক্তিদের নেতৃত্বে এসব সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।
গত বুধবার উত্তরা ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে মে ও এপ্রিল মাসে কেরানীগঞ্জ ও শেরপুরে অভিযান চালিয়ে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, এক লাখ টাকা মূল্যের জাল নোট মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল।
তদন্তকারীরা বলছেন, বর্তমানে অনেকেই ফেসবুক এবং ইউটিউবে ভিডিও দেখে জাল টাকা তৈরির কৌশল শিখছে। ল্যাপটপ, উন্নত মানের প্রিন্টার, স্ক্যানার এবং বিশেষ ধরনের বন্ড পেপার ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে এই নকল নোট। আসল নোটের মতো খসখসে ভাব আনতে এবং সিকিউরিটি থ্রেড বা নিরাপত্তা সুতা নকল করতে তারা বিশেষ চকচকে কাগজ বা আঠা ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কম মানের আসল নোটের লেখা রাসায়নিক দিয়ে মুছে ফেলে সেখানে উচ্চ মূল্যের নোটের নকশা ছাপিয়ে দেওয়া হয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক জানান, জাল টাকা চেনার বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। বর্তমান নির্দেশিকাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এই সুযোগেই অপরাধী চক্রগুলো প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।


