তুচ্ছ বিরোধকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জে বেড়েই চলেছে রক্তক্ষয়ী গ্রাম্য সংঘর্ষ। ফুটবল খেলা, শিশুর ঝগড়া কিংবা সালিশ বৈঠকের মতো সাধারণ বিষয় নিয়ে বারবার রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে জেলার বিভিন্ন এলাকা।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলাজুড়ে ১০৪টি সংঘাতের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৮০৭ জন, যাদের অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টানা সংঘাত আর অস্থিতিশীলতায় আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে পুরো জেলা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর বাহুবলের মিরপুর বাজারে ফুটবলের সময়সূচি নিয়ে বিরোধে টর্চলাইট জ্বালিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে জড়ায় দুই গ্রামবাসী। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হন এবং ভাঙচুর করা হয় বেশ কিছু দোকানপাট। এর আগে ৩০ আগস্ট বানিয়াচংয়ে শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে মাইকিং করে ৬টি মহল্লার মানুষ সংঘাত লেগে অন্তত ৩০ জন আহত হন।
তুচ্ছ ঘটনা ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এসব সংঘাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সালিশ বৈঠকও। গত ১৯ আগস্ট হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ দ্বন্দ্বে ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। ৭ এপ্রিল মাধবপুরের বুল্লা গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধের সালিশিতে সংঘর্ষে মোহাম্মদ আলী নামের এক বৃদ্ধ নিহত ও ৩০ জন আহত হন। এর আগে ১৫ জুন বাহুবলে কবরস্থানের রাস্তা নিয়ে সংঘর্ষে সেলু মিয়া ও হেলাল মিয়া নামের দুই ব্যক্তি প্রাণ হারান। এ ছাড়া ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ, ফুটবল ম্যাচের সমর্থক এবং ঈদের জামাত নিয়ে ঘটাসহ একের পর এক সংঘাতের চিত্র সামনে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত বছরও এই জেলায় ৯৫টি সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত এবং প্রায় ১২০০ মানুষ আহত হয়েছিলেন।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল বলেন, হবিগঞ্জ এখন আশঙ্কাজনকভাবে দাঙ্গাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করতে হবে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন জানান, সামান্য বিরোধ থেকে পুরো গ্রাম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার এই প্রবণতা সামাজিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। সংঘাত নিরসনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ দেন তিনি।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনছে। উদ্ধার করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র। সাধারণ বিষয় নিয়ে সংঘাত এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনো অবস্থাতেই অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


