সরকার ও জামায়াত: সংঘাত নাকি কৌশলগত বন্ধুত্ব?

সরকার ও জামায়াত: সংঘাত নাকি কৌশলগত বন্ধুত্ব?
Advertisement
Advertisement

এক বৈচিত্র্যময় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি। দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতার পালাবদল এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে, তাতে সরকার ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার সম্পর্ক এক কৌতূহলোদ্দীপক মোড় নিয়েছে।

একদিকে রাজপথের দাবি-দাওয়া, অন্যদিকে পর্দার অন্তরালে সমঝোতার গুঞ্জন—সব মিলিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বিরোধী দলের এই আন্দোলন কি কেবলই চাপ সৃষ্টির কৌশল নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো হিসেব কাজ করছে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলে রাজপথের আন্দোলন সবসময়ই নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি বড় পরিবর্তনেই রাজপথ ছিল প্রধান ক্ষেত্র।

বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতে এই দুই দল দীর্ঘ সময় জোটবদ্ধ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যকার রসায়ন বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এখন সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়ে একটি সুপরিকল্পিত ‘চাপ প্রয়োগের রাজনীতি’ বেছে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে সরকারকে চাপে রাখা।

সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট: তারা বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চান না। বরং তারা একটি গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছেন।

তবে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে এই সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, বিরোধী দলের আন্দোলনের পেছনে বাস্তবসম্মত ইস্যুর ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, সরকার ইতিমধ্যে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং এ নিয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান। ফলে আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের উদ্দেশ্য নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছেন। তিনি বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডকে ফ্যাসিবাদী শাসনের পাঁয়তারা হিসেবেও অভিহিত করেন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও সরকার মোটের ওপর একটি সহনশীল অবস্থান বজায় রাখছে।

দুই দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, বাইরে থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলা হলেও ভেতরে ভেতরে আস্থার সংকট এখনো প্রবল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আন্দোলন কৌশলটি বেশ দ্বিমুখী। তারা রাজপথে কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের জনভিত্তি ও সাংগঠনিক শক্তি জানান দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখছে।

এই পরিস্থিতিকে অনেকেই ‘চাপ ও সমঝোতার’ রাজনীতি বলে মনে করছেন। অর্থাৎ, বিরোধী দল চায় তাদের দাবিগুলো আদায় করতে; সরকার চায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে। এই দুই পক্ষের স্বার্থের মিলনস্থলে কোনো গোপন সমঝোতা আছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা রয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সংঘাতের বদলে কৌশলগত অবস্থানই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দলের এই লুকোচুরি খেলা শেষ পর্যন্ত দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কতটা শক্তিশালী করবে, তা নির্ভর করছে তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও জাতীয় স্বার্থের ওপর। রাজপথের এই চাপ যদি শেষ পর্যন্ত সংস্কারমুখী হয়, তবে তা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। তবে আস্থার এই সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে রাজনীতির এই নতুন সমীকরণ যেকোনো সময় আবার সংঘাতের পথে মোড় নিতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর