গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) আলী রীয়াজ।
শনিবার সকালে রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভার আয়োজন করে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসন।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘এবারের গণভোট কোনো দলকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতায় যেতে বাধা দেওয়ার বিষয় নয়। এটি জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের অ্যাজেন্ডা, যা বাংলাদেশের সব মানুষের। এই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নেওয়া হবে এবং আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, তা নির্ধারিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় একবাক্যে মত পাওয়া গেছে যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। যারা বাধা আছে বলে প্রচার করছে, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে বিষয়টি উত্থাপন করছে।’
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, ‘যারা ওই সময়ে সংগ্রাম করেছেন, জীবন দিয়েছেন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারা আমাদের দুটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এক, যেন ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র আর ফিরে আসতে না পারে। দুই, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পথনকশা নির্মাণ।’
তিনি বলেন, ‘দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। আগামী অন্তত ৪০ বছর বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, সেই পথ নির্ধারণ করা আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশকে সাফল্য ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।’
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, একই সঙ্গে নাগরিক। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের সেবায় সচেষ্ট থাকা এবং আইন মানা, শৃঙ্খলা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব তাদের ওপর ন্যস্ত। সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই গণভোটে মানুষকে সচেতন করা ও ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচিত হবে।
গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তির কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, দীর্ঘ সময় ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেকের কাছেই গণভোট নতুন অভিজ্ঞতা। তাই ব্যালটে কীভাবে ভোট দিতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী, তা স্পষ্টভাবে জনগণকে বোঝাতে হবে। তারা জানান, ব্যালটে থাকা ‘টিক চিহ্ন’কে প্রচারণার মূল প্রতীক ধরে ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকার তিনটি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে-সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। সরকার নির্বাচন আয়োজন করে না, বরং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন, আর বিচার পরিচালনা করে আদালত; সরকার শুধু সহায়ক ভূমিকা রাখে।
অতীতে সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে হয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন যেন আর ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় না হয়, সে জন্যই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা জরুরি।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে আসছে। তবে কার্যত প্রশ্নটি একটাই—আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে।
তিনি বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু গত ৫৪ বছরে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থান সেই লক্ষ্য পূরণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, যা গণভোটের মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে।
ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
সভায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।


