দেশজুড়ে হাম রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও টিকার তীব্র সংকট মোকাবিলায় দৌড়ঝাপ শুরু করেছে সরকার। হাম আক্রান্ত হয়ে সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫৩ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরিভাবে সারাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি পরিমাণ টিকা মজুত আছে, সে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে টিকার বর্তমান মজুত জানতে আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ৩১ মার্চের মধ্যে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেসের (ডিজিএইচএস) কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হাম টিকার মজুত সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়ার পরই টিকাদান ক্যাম্পেইন বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডিজিএইচএসের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হামিদুর রশীদ জানান, গত রোববার পর্যন্ত সারাদেশে ৬৭৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা এরইমধ্যে দেড় হাজার ছাড়িয়েছে।
ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোর-এই সাত জেলায় হাম পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর আকার ধারণ করেছে।
ইপিআই-এর আওতায় সরকারিভাবে হাম-রুবেলা (এমআর) সহ প্রতিবছর প্রায় ১২টি রোগ প্রতিরোধে নয় ধরনের টিকা দেওয়া হয়। তবে সম্প্রতি ডিপো কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ডিপোতে এমআরসহ ছয় ধরনের টিকা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪২ লাখ শিশুর জন্ম হয়। নতুন শিশুসহ বছরে দেশে হাম টিকার চাহিদা প্রায় এক কোটি ডোজ।
নিয়মিত টিকার সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরকার এখন বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাম্পেইনের জন্য সংরক্ষিত দুই কোটির বেশি ডোজ টিকা থেকে এখন নিয়মিত কার্যক্রমে ব্যবহার শুরু করা হবে।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন- স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) পরিকল্পনা অনুমোদনে বিলম্বের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকেই বিভিন্ন হাসপাতালে টিকার ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও নীতিগত দুর্বলতার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে শিশুদের।
হাম সংক্রামণে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
এদিকে, হাম আক্রান্ত হয়ে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের সারি। সোমবার পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ৫৩ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালেই ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ৬ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সবার আগে তাই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
ডিজিএইচএসের ব্যবস্থাপনা তথ্য বিভাগের পরিচালক ডা. আবু আহমদ আল মামুন জানান, বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে যুক্ত হয় না। ফলে সারাদেশে হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক
দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দাবি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি সম্প্রতি দাবি করেন, দেশে গত আট বছর টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে টিকাদান কার্যক্রম চালু ছিল এবং অধিকাংশ শিশুকেই টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু কল্যাণ সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৯ সালে ইপিআই চালুর পর দেশে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এখনো প্রায় ৭০ হাজার শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে।
গত বছরের ১৯ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাবিত পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি বাতিল করে। এই কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বড় আকারের এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ
হাম টিকার সংকট মোকাবিলায় এরইমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে টিকা কেনার জন্য ৮৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার অর্ধেক এরইমধ্যে ব্যয় করা হয়েছে।
এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় আরও ৬০৪ কোটি টাকার টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য সচিব শফিউল আলম জানিয়েছেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনা টিকার চালান এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই দেশে পৌঁছাতে পারে। মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় দুই কোটি সিরিঞ্জ সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় টিকাদান কমিটি আগামী জুনেই ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটি শিশুকে হাম টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া জুলাই-আগস্টে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করবে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আগামী মে মাসের মধ্যেই তারা কর্মপরিকল্পনা দেবে এবং সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


