হামের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের ঋণে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে এক জরিপে। এতে দেখা গেছে, আক্রান্ত পরিবারের ৬১ শতাংশের সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে ১০টির মধ্যে প্রায় ৯টি পরিবার ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ মূল্যায়নে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি আক্রান্ত পরিবারের ওপর এই জরিপ পরিচালিত হয়।
এতে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা মূলত বিনামূল্যে দেওয়া হলেও একটি আক্রান্ত পরিবারের চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবার জানিয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি চাহিদা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৩৩ শতাংশ পরিবার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং ২২ শতাংশ পরিবার খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
মূল্যায়নে দেখা গেছে, ৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে গৃহস্থালির সম্পদ বিক্রি করেছে এবং ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে।
জরিপে অন্তর্ভুক্ত হাম রোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের কম, ১৯ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর এবং বাকি ৬ শতাংশের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও রোগীর পরিবারের সদস্যদের যাতায়াত, চিকিৎসা পরীক্ষা, ওষুধ, খাবার, হাসপাতালে অবস্থান এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়ের ভার বহন করতে হয়েছে।
মূল্যায়নের ভিত্তিতে ২ হাজার ৪০০টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তা হিসেবে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে আরও দেখা যায়, হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে অনেক অভিভাবক আয় বা চাকরি হারিয়েছেন। আক্রান্ত পরিবারের ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
রংপুরের হাজেরা খাতুন তার ১১ মাস বয়সী মেয়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসা বাবদ তার মোট ব্যয় হয়েছে ৭০ হাজার টাকারও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াই ছিল।
তিনি জানান, খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পরিবারকে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এ সময় সৌদি আরবে কর্মরত তার স্বামীও ওই মাসের বেতন পাননি।
বিডিআরসিএসের মহাসচিব কবির এম আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে আক্রান্ত পরিবারগুলো একদিকে স্বাস্থ্য সংকট, অন্যদিকে তীব্র আর্থিক সংকটের মুখোমুখি।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।’
বাংলাদেশে আইএফআরসির প্রতিনিধি দলের প্রধান আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, ‘হামের এই জরুরি পরিস্থিতির প্রভাব হাসপাতালের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। অসুস্থ স্বজনের পরিচর্যা করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।’
আইএফআরসি ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায় বিডিআরসিএস সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি ১ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবককে টিকাকেন্দ্র পরিচালনায় সহযোগিতা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি-যোগাযোগ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা গ্রহণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।


