যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এখনো স্থবির হরমুজ প্রণালি। উপসাগরে আটকে থাকা ছয় শতাধিক জাহাজের মধ্যে যুদ্ধবিরতির তিন দিনে কেবল ১২টি জাহাজ হরমুজ পার হতে পেরেছে বলে জানিয়েছে বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপ্লার।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ও তেহরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরলেও হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অচলাবস্থায় ফের জ্বালানি সংকটের শঙ্কা জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ তথ্য থেকে জানা গেছে যুদ্ধবিরতিতে খুবই অল্পসংখ্যক জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার মাত্র পাঁচটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে। বৃহস্পতিবার হরমুজ অঞ্চলে অবস্থান জানিয়ে চলাচল করেছে কেবল সাতটি জাহাজ।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দিন মঙ্গলবার ১১টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। তবে ইরানের কড়া হুশিয়রি, ইসরায়েল-লেবানন অব্যাহত যুদ্ধ, জলজ মাইনের ঝুঁকি এবং বিকল্প পথে চলাচলে তুলনামূলক বেশি সময় খরচ হওয়ায় ছয়শর বেশি জাহাজ উপসাগরে আটকে আছে। এসব জাহাজের মধ্যে ৩২৫টিই জ্বালানি ও তেলবাহী ট্যাংকার।
ক্লেপলারের বাণিজ্য ঝুঁকি বিশ্লেষক আনা সুবাসিচ বৃহস্পতিবার এক বিশ্লেষণে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে দৈনিক শতাধিক জাহাজ চলাচল করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটায় জাহাজ চলাচল আবার শুরু হলেও তা খুবই সীমিত। ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫টি জাহাজ হরমুজে ঘোষিত বিকল্প পথে চলাচল করতে পারবে।
এই পথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজে সব জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না।
সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে খুবই বাজে কাজ করছে, কেউ কেউ বলবে এটি অসম্মানজনক। এটি আমাদের চুক্তি ছিল না।’
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আরও আগেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরিত চুক্তি ভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ করেন। লেবাননে ইসরায়েলের চলমান হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে, নাকি মিত্র ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। অঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার আগে ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ হারাবে না।’
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, ‘লেবাননে হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব দেখছে। বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করবে কি না, তা দেখছে বিশ্ব।’
এদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমে গেলেও, বাস্তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম শুক্রবার গ্রিনিচ সময় রাত ২টায় ৯৬ দশমিক ৩৯ ডলারে দাঁড়ায়, যা যুদ্ধবিরতির পর বুধবার ৯৫ ডলারের নিচে নেমেছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ আল জাবের বৃহস্পতিবার বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এখনো উন্মুক্ত নয়। সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং শর্তসাপেক্ষ। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই পথ ব্যবহার করতে হলে অনুমতি ও শর্ত মানতে হবে, যা মুক্ত নৌ চলাচল নয়, বরং চাপ প্রয়োগ।’


