মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। আমদানি বিল পরিশোধের জন্য ব্যাংকগুলো ডলার সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়ায় একদিনেই ডলারের দাম ৪০ পয়সার বেশি বেড়ে গেছে।
ব্যাংকারদের মতে, সোমবার আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কয়েক মাসের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় দৈনিক উত্থান।
এই চাপের প্রতিফলন দেখা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেফারেন্স রেটেও। সোমবার বিকাল ৫টায় রেফারেন্স রেট দাঁড়ায় প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৫৫ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের শেষে ছিল ১২২ দশমিক ৩৮ টাকা।
বিশ্ববাজারেও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের জেরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ডলারের শক্তি বাড়াচ্ছে।
দেশীয় বাজারে ব্যাংকাররা বলছেন, কয়েকটি তাৎক্ষণিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ডলারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে আমদানিকারকদের ইউপাস এলসি দায় পরিশোধ, সরকারের বকেয়া আমদানি এলসি পরিশোধ এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ব্যবসায়ীদের আচরণেও প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, ‘ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক আমদানিকারক ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে আগেভাগেই বিদেশি দায় পরিশোধের চেষ্টা করছেন। এতে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে।’
তিনি আরও জানান, চলতি সপ্তাহে সরকারের বড় অঙ্কের আমদানি এলসি পরিশোধও ডলারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
বাজারের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ মার্চ থেকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে, যাতে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা যায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যা সামনের মাসগুলোতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়ছে এবং তেলের দামও বাড়ছে। ফলে আমদানিকারকরা সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত বিদেশি বিল পরিশোধ করতে চাইছেন। এতে অনেক ব্যাংক শর্ট পজিশনে চলে যাচ্ছে এবং ডলারের চাহিদা বাড়ছে।’
ব্যাংকারদের ভাষায়, যেসব ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য দায় তাদের আয় থেকে বেশি, তারা শর্ট পজিশনে থাকে। এসব ব্যাংককে বাজার থেকে ডলার কিনতে হয়। অন্যদিকে যেসব ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বেশি, তারা লং পজিশনে থাকে এবং তাদের কাছে ডলারের উদ্বৃত্ত থাকে।
সোমবার কয়েকটি ব্যাংক রেমিট্যান্সের ডলার সর্বোচ্চ ১২২ দশমিক ৭০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনেছে, যা বাজারে ডলারের সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিলস ফর কালেকশন (বিসি) লেনদেনে আমদানিকারকদের আরও বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৬ থেকে ১২২ দশমিক ৮ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।


