সৌদি জোটে বাংলাদেশ: প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন পথে ঢাকা

সৌদি জোটে বাংলাদেশ: প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন পথে ঢাকা
ছবি: জাকির হোসেন
Advertisement
Advertisement

প্রচলিত কূটনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১৪ দেশের একটি কৌশলগত সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করল বাংলাদেশ।

দীর্ঘদিন ধরে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই সাংবিধানিক নীতিতে পরিচালিত হয়ে আসা ঢাকা এখন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় একটি বাস্তববাদী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (বাংলাদেশ প্রথম) নীতির দিকে এগোচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এই জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। নতুন এই জোটের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

এই উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।

ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তফা কামাল রুশো বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য পরিবহন সমুদ্রপথে হওয়ায় এই উদ্যোগকে কোনো জোট রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে না দেখে বরং একটি অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা উচিত।

ঝুঁকিপূর্ণ এক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র চাপের সময়ে এই জোট গঠিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

এর ফলে বিকল্প পথ হিসেবে বাব আল-মান্দেব-লোহিত সাগর রুটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে ওই অঞ্চলটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

রুশো বলেন, এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন নয়; বরং পরিবর্তিত সামুদ্রিক পরিবেশে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কৌশলগত বিকাশ।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের প্রায় সব অপরিশোধিত তেল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে বা ওই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করায় লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালির স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন

আরও পড়ুন

তাৎক্ষণিক বাণিজ্য সুরক্ষার পাশাপাশি এই জোট বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রমের পরিধি ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।

জোটের কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান পরিকল্পনা এবং বহুজাতিক সামুদ্রিক মহড়া।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সহযোগিতা ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর দায়িত্বশীল সামুদ্রিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানও সুদৃঢ় হবে।

এই সহযোগিতার মাধ্যমে জলদস্যুতা দমন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, মানবিক সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।

ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলেও এই জোট বাংলাদেশের ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ পররাষ্ট্রনীতির জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

এই জোটে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান ও কাতারের মতো দেশ রয়েছে। তবে বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় ইরান। বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং তেহরান সাধারণত ঢাকাকে নিরপেক্ষ অংশীদার হিসেবে দেখে।

একজন সাবেক কূটনীতিক টাইমসকে বলেন, ঢাকাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার জন্য। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অবস্থান নেওয়ার জন্য নয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই জোট ইরানের প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তা কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী ও উন্নয়ন সহযোগী চীনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরের জ্বালানি রুট নিরাপদ রাখার বিষয়ে চীনের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।

একইভাবে বঙ্গোপসাগরের প্রধান সামুদ্রিক শক্তি ভারতও এই নতুন কাঠামো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা

এই উদ্যোগের অন্যতম কারণ হলো সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা।

তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ সামুদ্রিক যোগাযোগ এই শ্রমবাজারকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

তবে রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। যদি এই জোট ইরান, ইয়েমেন বা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এতে অবকাঠামো প্রকল্প, কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোস্তফা কামাল রুশো বলেন, নিরাপদ সমুদ্রপথ ও ভারত মহাসাগরে কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধির সুফল ধরে রাখতে হলে ঢাকাকে অবশ্যই তার কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটের সদর দপ্তর সৌদির একটি শহরে স্থাপন করা হবে। জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর অন্যান্য দেশও এতে যোগ দিতে পারবে।

বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে জোটটি কতটা প্রতিরক্ষামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক থাকে তার ওপর।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad