চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের নাম জঙ্গল সলিমপুর, যা একসময় সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করত। দীর্ঘদিন ধরে ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে কুখ্যাত এই বিশাল এলাকাটি বছরের পর বছর ধরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন এই বিচ্ছিন্ন অঞ্চলটি একটি নতুন পরিচয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে ভূমি একসময় ভয়ের কারণে স্থবির হয়ে ছিল, সেখানে উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে গত ৪ জুন বিকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোডের আলীনগর স্কুল থেকে ৩ নম্বর বাজার পর্যন্ত প্রায় পৌণে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা এই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে।
অপরাধীদের আস্তানা থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ:
স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরের ৩ হাজার ১০০ একর বিশাল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এই এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে এখানকার বাসিন্দাদের জিম্মি করে রেখেছিল। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতেন। অতীতে এই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন র্যাবের একজন কর্মকর্তা।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে গত ৩১ মে, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করে এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সড়ক নির্মাণ কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, বরং পুরো এলাকাটিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।
কারিগরি পরিধি ও প্রকৌশল কৌশল:
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (২৬ ইসিবি) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আওতায় পুরো এলাকা জুড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করার কথা রয়েছে।
২৬ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ জানান, বর্তমানে আলীনগর স্কুল থেকে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও মাটি কাটার কাজ চলছে। এই রাস্তাটি ১৮ ফুট চওড়া হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে এই প্রকল্পে অন্তত তিনটি বড় সেতু এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া পাহাড় ধস রোধে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রিটেইনিং ওয়াল বা নিরাপত্তামূলক দেয়াল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদ বলেন, বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকায় কাজ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও সেনাবাহিনী সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করছে। প্রথম বর্ষায় মাটি কেটে রাস্তার ভিত্তি তৈরি করার ফলে বৃষ্টির পানিতে মাটি স্বাভাবিকভাবেই বসে শক্ত হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাস্তাটিকে আরও টেকসই করে তুলবে।
ফলে বৃষ্টির কারণে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হচ্ছে না। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেই পুরোদমে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও নিরাপত্তা:
পুরো প্রকল্পটি শেষ হতে আনুমানিক ছয় থেকে সাত মাস সময় লাগতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে এই এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি নিবিড় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, এই সড়ক জঙ্গল সলিমপুরের মানুষের জীবনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বর্তমানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এখানকার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, যার ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়েছেন।
নতুন রাস্তাটি চালু হলে আলীনগরের বাসিন্দারা সহজেই ভাটিয়ারী লিংক রোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং হাটহাজারী রোডে যাতায়াত করতে পারবেন। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি বৃদ্ধির ফলে অপরাধ দমনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, প্রকৃত বাসিন্দাদের পুনর্বাসন না করে কোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে না।
সন্ত্রাসী ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রয়েছে। বছরের পর বছর ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর এখন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে জঙ্গল সলিমপুরের মানুষ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকাটি উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।


