জুবায়ের তানিন, দুবাই থেকে
ভারতের লক্ষ্য ১৭২, ইনিংসের প্রথম বলেই শাহীন শাহ আফ্রিদির বাউন্সারে অভিষেক শর্মার পুলে ডিপ ফাইন লেগ দিয়ে ছয়। রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এই এক শটেই সেট হয়ে গিয়েছিল এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সুপার ফোরের লড়াইয়ের সুর। কারণ এরপর অভিষেক আর শুবমান মিলে যা করলেন, তাতে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইয়ের সেই পুরনো ছবিটাই ফুটে উঠল। আরো একবার প্রমাণ হয়ে গেল, আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই ম্যাচে দিনশেষে কথা হয় ভারতের এক তরফা দাপট নিয়েই।
সেই ধারাবাহিকতায় টি-টোয়েন্টিতে পাকিস্তানের দেয়া রেকর্ড ১৭২ রানের লক্ষ্য ভারত টপকে গেল মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে। ৭ বল হাতে রেখে পাওয়া ৬ উইকেটের এই রেকর্ড জয়ে ভারতের সুপার ফোর শুরু হলো জয় দিয়ে। দুই দলের শেষ ১৫ ম্যাচের ১২টাই জিতল ভারত। অবশ্য গ্রুপ রাউন্ডের পর সুপার ফোরেও এমন ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল, কারণটা ভারতের বিশ্বসেরা বোলিং আক্রমণ আর টি-টোয়েন্টির ব্যাটিংটা রপ্ত করে ফেলা ব্যাটাররা।
অথচ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনার কোনো কমতি নেই এশিয়া কাপে। সর্বনিম্ন ৩৭৫ দিরহাম থেকে শুরু এই ম্যাচের টিকেট, তবুও দর্শকদের আগ্রহের তুঙ্গে। মিডিয়া কভারেজ, প্রোমোশনেও নেই কোনো ছাড়। ভারত আর পাকিস্তান ছাড়া কোনো দেশের সাংবাদিকদের দেয়া হয়নি ম্যাচ পাস। এর ওপর পেহেলগাওয়ের ঘটনার প্রভাব পড়েছে দুই প্রতিবেশী দেশের খেলার মাঠেও। সেই জেরে গ্রুপ রাউন্ডের ম্যাচ শেষে ভারতের ক্রিকেটাররা হাত মেলাননি পাকিস্তানিদের সাথে। জবাবে পাকিস্তান দুই দফায় বয়কট করেছে সংবাদ সম্মেলন। এমনকি খেলতে সম্মতি ছিল না টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচেও।
এই ম্যাচেও রইল সেই প্রভাব। নিয়মানুযায়ী টসের সময় হাত মেলাননি দুই দলের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব আর সালমান আলী। ভদ্রলোকের খেলার নিয়মিত এই দৃশ্য ছাড়াই শুরু হয় সুপার ফোরের দ্বিতীয় ম্যাচ। অবশ্য ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের মাঠের পারফরম্যান্সের যে দশা, তাতে এই হ্যান্ডশেক কাণ্ড আর ম্যাচ বয়কটের সম্ভাবনা না জাগলে, লড়াইয়ের ঝাঁজটাই হয়তো মিইয়ে যেত!
ভারতের দুই ওপেনার সেসব নিয়ে ভাবছিলেন কিনা কে জানে! তবে তারা ম্যাচটা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে চাইছিলেন সেটা নিশ্চিত। পাওয়ারপ্লেতে এবারের এশিয়া কাপের সর্বোচ্চ রান তুলেছে ভারত, বিনা উইকেটে ৬৯। দলীয় ১০০ পেরিয়েছে ৮.৫ ওভারে। ফাহিম আশরাফের অফ কাটারে শুবমান বোল্ড হওয়ার আগে ওপেনিং জুটিতে উঠেছে ৫৯ বলে ১০৫।
এই দুজন যতক্ষন উইকেটে ছিলেন, পাকিস্তানি বোলাররা জায়গা খুঁজে হন্য হয়েছেন, কোথায় বল করবেন ভেবে। ফিফটি মিস করলেও শুবমান ছিলেন আজ দুর্দান্ত। আটটা চার মেরেছেন, শট খেলেছেন উইকেটের চারপাশে। ফুল লেংথ বলে দুটো শট, সুইপ আর রিভার্স সুইপ। বাউন্সারে পুল, ধরে আসা বলে লেট কাট। ২৮ বলে ৪৭ রানে ফিরেছেন ভারতের সহ-অধিনায়ক।
ওদিকে বাঁহাতি অভিষেক, উইকেট দিয়েছেন আবরার আহমেদকে একটা হাফ শটে। তবে এই আবরারের ওপর দিয়েই গিয়েছে সবচেয়ে বড়ট ঝড়টা। ৩৯ বলে ৭৮ রানের ইনিংসে অভিষেক ছক্কা মেরেছেন পাঁচটা, এর মধ্যে চারটাই জুটেছে আবরারের ভাগে, সাথে একটা চারও। লেংথ বাড়িয়ে-কমিয়ে কোনোভাবেই এই লেগ স্পিনার সুবিধা করতে পারেননি তার বিপক্ষে। দুই ওপেনারের পর অধিনায়ক সূর্যকুমার ফিরেছেন শূন্য রানে। তবে শেষটায় তিলক ভার্মার ১৯ বলে ৩০ রানের ইনিংসে ম্যাচটা জিততে একদমই বেগ পেতে হয়নি ভারতের।
এর আগে টসে হেরে পাকিস্তানের হয়ে ব্যাট করতে নামা সাহিবজাদা ফারহান নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন। ৫৮ রানের ইনিংসে জীবন পেয়েছেন দুইবার। প্রথমটা ইনিংসের তৃতীয় বলে, এরপরেরটা আট নম্বর ওভারের দ্বিতীয় বলে। প্রথমটায় বোলার ছিলেন হার্দিক পান্ডিয়া, দ্বিতীয়টায় বরুণ চক্রবর্তী। সব মিলিয়ে ভারত আজ ক্যাচ ফেলেছে চারটা, এর মধ্যে দুটো ফস্কেছে অভিষেক শর্মার হাত থেকে, একটা করে ছেড়েছেন কুলদীপ যাদব আর শুবমান গিল।
এই চার ক্যাচ মিসের সুবিধা পাকিস্তান নিয়েছে বেশ ভালোভাবেই। নইলে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ সংগ্রহ পাওয়ার কথা ছিল না তাদের। ওপেনিংয়ে ফখর জামানের সাথে ২১ রানের জুটি, এরপর টানা তিন ম্যাচে শূন্যতে ফেরা সাইম আইয়ুবের সাথে ফারহানের ৭২ রানের জুটি। যদিও সেই জুটিতে সবচেয়ে বেশি অবদান ফারহানেরই।
অবশ্য এক অনুচ্ছেদ আগেই পড়েছেন, ভারতের ফিল্ডাররা যেভাবে ক্যাচ ছেড়েছেন, তাতে বড় ইনিংস না খেললে সেটা অপরাধের পর্যায়েই পড়ত। তিন ছক্কা আর পাঁচ চারে ৪৫ বলে খেলেছেন ৫৮ রানের ইনিংস। অবশ্য যেভাবে ব্যাট ফস্কে ক্যাচ তুলে আউট হয়েছেন শিভাম দুবের বলে, তাতে একটু হাসির খোড়াকও জুটেছে। দুবের অফ কাটারে লফটেড স্কয়ার কাট করতে গিয়ে হাত থেকে ব্যাট ছুড়ে যায় তার। মিড অফে দাঁড়িয়ে সহজ ক্যাচ ধরেছেন অধিনায়ক সূর্যকুমার।
মিডল অর্ডারে হুসাইন তালাত, মোহাম্মদ নওয়াজরা দুই অংকের ঘরে পৌঁছালেও কেউ ইনিংস বেশি বড় করতে পারেননি। এর মাঝে নওয়াজের রান আউট, কুলদীপের বলে রিভার্স সুইপে তালাতের ক্যাচ থামিয়ে দিয়েছিল রানের গতি। শেষদিকে ৮ বলে ২০ রানের ইনিংসে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন ফাহিম আশরাফ।


