শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: আইন নয়, রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: আইন নয়, রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে
শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর এখন আবার সামনে চলে এসেছে ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়টি। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও বিষয়টি নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের সরকারি তত্ত্বাবধানে দিল্লিতে বসবাস করছেন। আর একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কলকাতার কোথাও থাকেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ যথানিয়মে চলেছে, সোমবার রায়ও দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এই রায়ের অনেক আগে গতবছর ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য দিল্লির কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। বরং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একাধিকবার বলেছেন, বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আলোচনার উপর নির্ভর করছে।

সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগে পরিস্থিতি একরকম ছিল। এখন মামলার রায় হয়েছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল দুজনেই আদালতে দণ্ডিত অপরাধী। বিষয়টি জানিয়ে তাদেরকে প্রত্যর্পণের জন্য আবারও ভারতের কাছে চিঠি দেওয়া হবে।

যদি কোনো তৃতীয় দেশ এই অপরাধীদের আশ্রয় দেয়, তবে তা হবে অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞার সামিল, মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ রক্ষা করা ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে শেখ হাসিনার রায়ের পর বিবৃতি দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রতি ভারত নজর রেখেছে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসাবে বাংলাদেশের শান্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রতি ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারত সবসময় বাংলাদেশের সকল অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক রেখে চলবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

আইন ও রাজনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তির ৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে যে, প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ করা ব্যক্তির অপরাধ যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে, ৬ (২) ধারায় বলা হয়েছে যে, হত্যা বা হত্যার সমতূল্য অপরাধ রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না।

বাংলাদেশ এবং ভারত ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি সই করে। তখন এতে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যর্পণের বিধান রাখা হয়েছিল। পরে পলাতক আসামি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য ২০১৬ সালে এই চুক্তি সংশোধন করা হয়। তখন এতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই যথেষ্ট বলে বিধান করা হয়।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যামামলা হলেও ভারত বরাবরই একে রাজনৈতিক বিষয় হিসাবে বিবেচনা করে আসছে।

গত ৬ অক্টোবর শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ নিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তিনি জানান, বিষয়টি দুই সরকারের মধ্যে আলোচনার দাবি রাখে। প্রত্যর্পণ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, প্রত্যর্পণ শুধু আইনি বিষয়ের উপর নির্ভর করে না। বরং রাজনৈতিক কারণের উপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশ তার অনুরোধ জানিয়েছে; এখন ভারত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আব্দুল হাই বলেন, ‘ভারতের পক্ষে হাসিনাকে হস্তান্তর করার সম্ভাবনা কম। কারণ নয়াদিল্লি তাকে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করে। তারা এমন কিছু করবে না যা তাদের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী হয়।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমানও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের কাছ থেকে এমন কিছু পাচ্ছে না যে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে।’

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মূলত শেখ হাসিনার কৌশলগত মূল্যের কারণেই ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে চায় না। কারণ তিনি দীর্ঘকাল ধরে নয়াদিল্লির একজন বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে বিবেচিত। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করে ফেলেছে।

ভারত এই অবস্থায় বাংলাদেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রভাব ফিরে পাওয়ার জন্য শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল হাই বলেন, ‘বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে ও ভালোভাবে গ্রহণ করার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ফেরত দেবে না।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad