আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কক্ষে তখন বিরাজ করছে এক নিস্তব্ধ উত্তেজনা। যেন ইতিহাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সবাই। রায় ঘোষণার নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে ১১টার অনেক আগেই বিশাল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটি ভরে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও আইনজীবীরা। অন্যদিকে, কক্ষে প্রবেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত কয়েকজন, কিছু ছাত্রনেতা এবং মানবাধিকার কর্মীদের মাঝে ছিল এক ধরনের ব্যস্ততা।
ভোর থেকে অপেক্ষারত কয়েক ডজন সাংবাদিককে কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় বেলা ১১টার কিছু পরে। ততক্ষণে অতিরিক্ত আসন ভরে গেছে, মানুষজন দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল খুবই কম। আইনজীবীদের একটি দর নিয়ে আসেন অ্যাটর্নি জেনারেল। আগেই নিজ নিজ আসনে বসেছিলেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও তার দল। অ্যাটর্নি জেনারেল গিয়ে চিফ প্রসিকিউটরের পাশে আসন গ্রহণ করেন। পাশের সারির প্রথম দিকের আসনে বসেছিলেন ‘পলাতক’ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের নিয়োগ করা আইনজীবী আমির হোসেন ও তার সহযোগীরা। বেলা সাড়ে ১১টায় লোকারণ্য হয়ে যায় আদালত কক্ষ।
আদালতে রায় প্রদানের কাজ শুরুর আগে খানিকটা বিভ্রান্তিতে পড়েন অনেকেই। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। অথচ কাঠগড়ায় তার বদলে দাঁড়িয়ে আছেন আমলা থেকে আওয়ামী লীগের নেতা হওয়া ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী। দ্রুতই জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভিন্ন এক মামলার সুবাদে তিনি এসেছেন।
অবশ্য কক্ষে উপস্থিত সবার মনোযোগের বিষয় ছিল ‘পলাতক’ আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যিনি নিজেকে ইস্পাত কঠিন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কক্ষে উপস্থিত প্রায় সবাই রায় কোন দিকে যাচ্ছে তা আঁচ করতে পেরেছিলেন, তবে তারা নিজের চোখে সেই রায় ঘোষণার দৃশ্য দেখতে এসেছিলেন। নীরব কৌতূহল ধরে রেখে অপেক্ষা করছিলেন তারা।
অবশেষে দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে এজলাশে ওঠেন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্য। এর কিছুক্ষণ পর কাচঘেরা কাঠগড়ার ভেতরে অতি সাধারণ একটি চেয়ারে গিয়ে বসেন হাফ-হাতা শার্ট পরা, ক্লিন শেভড সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। আগের দিনগুলোর তুলনায় দৃশ্যতই বেশি বিচলিত ছিলেন। সারাক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন, চোখ নিচের দিকে স্থির।
আদালতের কার্যক্রম শুরুর ঠিক আগে, চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম রায়টি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করার অনুমতি চান। আদালত সম্মতি দেন। এরপরই শুরু হয় রায় দেওয়ার পর্ব। সঙ্গে সঙ্গেই সাংবাদিকদের নোটবুকে কলম চলতে শুরু করে। অন্যরা আবেগ আর আগ্রহ নিয়ে শুনছিলেন, বিশেষ করে শেখ হাসিনার কঠোর শাসনের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীরা।
সাবেক আইজিপি মামুনের জন্য এটি ছিল ব্যক্তিগত এক অগ্নিপরীক্ষা। কোলের ওপর হাত রেখে, তিনি মেঝে থেকে তার দৃষ্টি সামান্যও সরাননি।
ভূমিকা পর্বের পর, ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চের চেয়ারম্যান অন্য দুই সদস্যকে তাদের রায়ের অংশগুলো পড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই প্রক্রিয়া চলে প্রায় এক ঘণ্টা। এর পুরোটা সময় সাবেক পুলিশ প্রধান মামুন মাথা তোলেননি। তিনি মাঝে মাঝে পলক ফেলছিলেন, কিন্তু একবারও বেঞ্চের দিকে বা কক্ষে স্থাপন করা বড় ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোর দিকে তাকাননি।
দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে রায়ের মূল অংশ পড়া শুরু করেন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। কক্ষের ভেতরের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। তিনি পর্যায়ক্রমে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো পাঠ করেন, প্রমাণের রূপরেখা দেন এবং আদালতের রায় দেন।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যায় প্ররোচনা ও উসকানির জন্য শেখ হাসিনাকে যখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, কক্ষে তখনো কোনো শব্দ শোনা যায়নি। আসল ধাক্কা আসে কিছুক্ষণ পর। যখন দ্বিতীয় অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন এজলাস চিৎকার আর করতালিতে ফেটে পড়ে।
অ্যাটর্নি জেনারেল দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে আদালতের পবিত্রতা বজায় রাখতে এবং নীরব থাকতে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যা শুনে হালকা গুঞ্জন শোনা যায়। তবে সাংবাদিক ও দর্শনার্থীরা সাবেক পুলিশ প্রধান মামুনের ভাগ্যের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলেন। কারণ, তদন্তকারীদের তার সহযোগিতা, দোষ স্বীকার এবং ক্ষমা চাওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বিবেচনা করে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।
এই প্রথম, নিথরভাবে শুনতে থাকা মামুন মাথা তোলেন। তিনি এজলাসের চারদিকে তাকান। মুখে হাসি ছিল না, তবে দৃশ্যতই স্বস্তি ছিল। রায়টি তার প্রত্যাশার চেয়ে হালকা মনে হয়েছিল। এরপর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে নিয়ে যান।
অনেকেই রায়ের মূল বিষয়বস্তু অনুমান করেছিলেন। কিন্তু রায় ঘোষণার পর কঠিনভাবে অনুভূত হলো এর চূড়ান্ত দিক। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী—যিনি ধারাবাহিক সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখায় অভিযুক্ত–এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় ভূমিকার জন্য তার বিচার হলো। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল চাকরির কোটা নিয়ে একটি ছাত্র আন্দোলনকে গুরুত্বহীন বলে খারিজ করে দেওয়া। ৩৬ দিনের মধ্যে, সেই স্ফুলিঙ্গ এক গণবিদ্রোহে পরিণত হয়, যা তার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করে।


