আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় ও নতুন বাজেট সহায়তার বিষয়টি আটকে আছে নীতিগত শর্ত পূরণের প্রশ্নে। তবে বাংলাদেশ ঋণ পাচ্ছে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি মূল্যে ভর্তুকি ও মুদ্রার বিনিময় হারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণ করবে চলমান ঋণ প্যাকেজের দুই কিস্তির ছাড় ও নতুন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ডিসেম্বরের বকেয়া কিস্তিসহ আগামী জুনে দুই কিস্তির এক দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি চলমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকট কাটাতে বাজেট সহায়তা হিসেবে তিন দশমিক দুই বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণের খোঁজে রয়েছে বর্তমান সরকার।
এ নিয়ে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকের সাইডলাইনে ১৪ থেকে ১৭ এপ্রিলে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৫টি বৈঠক হয়েছে। বৈঠক শেষে আইএমএফ কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বক্তব্য রেখেছে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু কারও বক্তব্যেই বাংলাদেশের ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি।
আলোচনায় সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র টাইমসকে জানিয়েছে, এসব বৈঠক ছিল মূলত মৌখিক পর্যায়ের, যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি আদান-প্রদান হয়নি। বৈঠকে বাংলাদেশ তার বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, আর আইএমএফ মৌখিকভাবে জানিয়েছে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখতে চায়।
এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে বাংলাদেশের লিখিত প্রস্তাবনার ওপর। আলোচনায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশে ফিরে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করবে। এতে উল্লেখ থাকবে ঋণ সহায়তা পেলে সরকার কোন কোন খাতে কী ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ নেবে। বিশেষ করে রাজস্ব বাড়ানো, জ্বালানি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার–এই চারটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ।
সূত্রগুলো বলছে, এই প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই পরবর্তী দরকষাকষি হবে। আইএমএফের একটি মিশন এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ বা মে মাসের শুরুতে বাংলাদেশে আসতে পারে। তবে প্রয়োজনে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের মাধ্যমেও আলোচনা এগোতে পারে। ওই বৈঠকগুলোতেই মূলত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হবে দুই পক্ষ।
আলোচনায় অগ্রগতি হলে একটি স্টাফ-লেভেল এগ্রিমেন্ট (এসএলএ) হতে পারে, যা আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় সন্তুষ্ট না হলে এসএলএ নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চলমান কর্মসূচির কিস্তি ছাড় এবং নতুন বাজেট সহায়তা–দুটিই অনিশ্চয়তায় পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আলোচনার বিষয়ে আশাবাদী অবস্থান তুলে ধরেছেন। ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এখনো আলোচনা চলছে। যেগুলো সমাধান হয়নি, সেগুলো সমাধান হবে।’
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের মনোভাব ইতিবাচক হলেও প্যাকেজের আকার বা শর্ত সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।
তবে আইএমএফের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। সংস্থাটি ১৬ এপ্রিল এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা–এই তিনটি ক্ষেত্রে এখনো কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণকে নিম্ন পর্যায়ে উল্লেখ করে আইএমএফ ইঙ্গিত দিয়েছে, এই খাতে অগ্রগতি ছাড়া কর্মসূচির অগ্রগতি ‘কঠিন’ হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএমএফ কর্মসূচি চালু রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফের মূল্যায়ন বিবেচনায় নেয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, বিনিময় হারের চাপ, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি না থাকা এবং ব্যাংকিং খাতের কিছু নীতিগত বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষ কোন কোন বিষয়ে একমত, তা এখনো পরিষ্কার নয়।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, এখনই হতাশ হওয়ার সময় আসেনি। তার মতে, আলোচনার প্রক্রিয়া এখনো খোলা রয়েছে এবং জুনের বোর্ড সভায় বিষয়টি তোলার মতো সময় এখনো বাংলাদেশের হাতে আছে।
এদিকে, একইরকম বক্তব্য এসেছে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে। দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, আলোচনায় কিছু ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মতামত এক রকম হয়নি। তবে দুই পক্ষই একমত হয়েছেন যে, আলোচনা চলমান থাকবে এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব হবে।
‘আইএমএফ পরিস্কার করে বলেছে, আইএমএফ বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীজন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের সময়কালে উন্নয়নের অংশীজন হয়েই আইএমএফ বাংলাদেশের পাশে থাকতে চায়,’ বলেন মর্তুজা।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঋণ প্রাপ্তির পুরো প্রক্রিয়া আগাতে সময়ের চাপেও রয়েছে বাংলাদেশ। এপ্রিল ও মে মাসে প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষি এবং সম্ভাব্য সমঝোতা সম্পন্ন হলে জুনে আইএমএফের পর্ষদে বাংলাদেশের প্রস্তাব দুটি উঠতে পারে।
পর্ষদে অনুমোদন মিললে দ্রুত ঋণের অর্থ ছাড় হতে পারে। তবে এই সময়সীমা ধরতে হলে নীতিগত সিদ্ধান্তে দ্রুত অগ্রগতি অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


