মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াকপিউ টাউনশিপে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ‘ভয়াবহ’ লড়াই চলছে। চীন সমর্থিত বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই টাউনশিপে জান্তা সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু হয় বিমান ও কামান হামলা।
হামলার আতঙ্কে এরই মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে হাজারো মানুষ।
কিয়াকপিউ শহর এবং ধন্যবতি নৌ ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে একসময়কার সংকীর্ণ ফ্রন্ট লাইনটি এখন বেশ অনেকটুকু এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির (এএ) কাছ থেকে এলাকা পুনরুদ্ধার করার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। যার ফলে রাতারাতি প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ সৈন্য, ট্যাঙ্ক এবং বিমান নিয়ে এসে যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তি বাড়ানো হয়েছে।
আরাকান আর্মির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এক ব্যক্তি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মিনপিন জ্বলছে। তাইং চাউং টাউং পাহাড় পুনরুদ্ধারের পর সামরিক বাহিনী এই এলাকায় ক্রমেই আঘাত করে চলেছে। প্রতিদিন বিমান হামলা চলে, এটা থামছেই না।’
শুক্রবার জান্তা বাহিনীর সৈন্যরা মিনপিনের কাছে আরাকান আর্মির একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি শিবির দখল করে নেয় এবং কাছাকাছি অন্যগুলোর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু তাদের এই বিজয় ছিল সংক্ষিপ্ত। কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায় এবং মিনপিন ফের আরাকান আর্মির দখলে যায়। সেই সময় কিয়াকপিউ এবং সুরক্ষিত নৌ সদর দপ্তরের দিকে যাওয়া মূল সড়কের ধারে জান্তা ঘাঁটিগুলোয় আঘাত হানে আরাকান আর্মি।
ঐ ব্যক্তি আরও বলেন, ‘সামরিক বাহিনীতে হতাহতের সংখ্যা বিশাল। তারা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে এবং পিছিয়ে গেছে। অন্যদিকে আবার সামনের দিতে এগোচ্ছে আরাকান আর্মি।’
গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কেন্দ্র কিয়াকপিউ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি এখন অনেকটা সামরিক দুর্গে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এক হাজারেরও বেশি সৈন্য সেখানে পৌঁছেছে এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একাধিক পদাতিক ও নৌ ইউনিট।
স্থানীয় অধিবাসী এবং উন্নয়ন কর্মীদের দাবি, জান্তা সরকারকে গোপনে ড্রোন ও কারিগরি দক্ষতা সরবরাহ করছে চীন। যদিও এই দাবির সত্যতা টাইমসের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
লড়াইয়ের তীব্রতার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সোমবার মিয়ানমারের একটি সামরিক জেট টাউংঙ্গু গ্রামে বোমা ফেলে। এতে তিন নারী নিহত এবং কমপক্ষে পাঁচজন আহত হন, যাদের মধ্যে দুজন শিশু।
কয়েক ঘণ্টা পর আরেকটি হামলায় ক্যাউকক্যালে এবং লেইকটিনে একটি স্কুল ধ্বংস হয়ে যায়। শিশুদের আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে তারা প্রাণে বেঁচে যায়।
কিয়াকপিউয়ের এক বাসিন্দা বলেন, ‘তারা ইচ্ছা করে স্কুলে হামলা করেছে। যদি শিশুরা ভেতরে থাকত, তাহলে অসংখ্য শিশু মারা পড়ত। নৌবাহিনী প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য করে গোলা ছুড়ছে। কেউ মাছ ধরতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। মানুষ আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।’
হামলার ফলে মানবিক বিপর্যয় বাড়ছে। গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে।
উন্নয়নকর্মীদের ধারণা, গত কয়েকদিনে ১০ হাজারের বেশি মানুষ শরনার্থী হয়ে পালিয়ে গেছেন। যাদের অনেকেরই এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো সব ছেড়ে পলায়ন। বিমান হামলা পিছু না ছাড়ায় তারা কেবল পালিয়েই বেড়াচ্ছেন।
একজন উন্নয়নকর্মী বলেন, ‘যতবারই তারা কোথাও বসতি স্থাপন করে, বিমান হামলা শুরু হয়। মানুষজন তাদের সন্তান ছাড়া আর কিছুই নিতে পারছে না। তারা কেবল দৌড়ে চলেছে।’
কিয়াকপিউতে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের বাস। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভারে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো উপচে পড়ছে। সেখানে খাবারের সংস্থান তো নেই-ই, মাথার ওপর ত্রিপলের ছাদটুকুও নেই।
সামরিক বাহিনী শহরটি অবরুদ্ধ করে পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় চাল, জ্বালানি ও ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো তাদের উপার্জনের একমাত্র উৎস হারিয়ে অকূল পাথারে পড়েছে।
একসময়ের শান্ত উপকূলীয় টাউনশিপটি এখন ভয়, পালিয়ে বেড়ানো এবং আগুনের জনপদে পরিণত হয়েছে। যেখানে সহিংসতা কমার কোনো লক্ষণই নেই।


