রংপুরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে গরুর আবাসিক হোটেল। বিশেষ করে কোরবানির সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারি বেপারীরা এই হোটেল ব্যবহার করে ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে পারছেন। শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাত্র একটি এমন হোটেল গরু বেপারীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
রংপুর মহানগরীর ধর্মদাস বারো আউলিয়া এলাকায় গবাদিপশুর এই আবাসিক হোটেলের নাম ‘আশানুর গরুর আবাসিক হোটেল’। আগে হোটেলটি নগরীর মডার্ন মোড়ে ছিল। রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত হওয়ায় হোটেলটির অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। ৫০ শতক জমির উপর টিনের ছাউনি দিয়ে গড়ে তোলা এই হোটেলে চার শতাধিক গরু রাখা যায়।
গরুর আবাসিক হোটেল গড়ে তোলার কারণ সম্পর্কে এর মালিক আশানুর ইসলাম মিয়া জানান, রংপুর অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক গরু চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কোটি কোটি টাকা নিয়ে এসব অঞ্চলের বেপারীরা গরু কিনতে আসেন। কিন্তু গরু কেনার পর হাট থেকে নিয়ে এসে এগুলো একসাথে জমা করে আবার নিজের এলাকায় নিয়ে যেতে বেপারীদের বিপাকে পড়তে হয়। একদিকে থাকে ছিনতাইয়ের ভয়ে, অন্যদিকে রাখার জায়গার অভাব। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সাত বছর আগে তিনি এ হোটেল শুরু করেন।
হোটেলটিতে প্রতি রাতের জন্য একটি গরুর জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হয়। তবে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ভাড়া ১০ টাকা বেশি। হোটেল থেকে গরুর খাবার দেওয়া হলে এর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট মূল্য।
আশানুর জানান, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার কারণে গরুর হোটেল নিয়ে তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। হোটেলের জায়গা আরও তিনগুণ বাড়ালেও গরু জায়গা দেওয়া যাবে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হোটেলের ভিতরে সারি সারি শত শত গরু। টিনের শেডে সূর্যের আলো ঢোকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। পুরো শেডে রয়েছে বেশ কয়েকটি ফ্যান। গরুকে খাবার দিচ্ছে বেপারীর লোকজন, হোটেলের কর্মচারীরা গোবর-মূত্র পরিস্কারের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। সারা দিনরাত চলে এই কর্মযজ্ঞ।
হোটেলে গরু রাখা চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আসা বেপারী আশিকুর রহমান ঠান্ডা মিয়া বলেন, আগে গরু কেনার পর অনেক চিন্তায় থাকতে হতো। ট্রাকে গরু তুলে সেই ট্রাকেই কাটতো পুরো সময়। আবাসিক হোটেল হওয়ায় এখন আর সেই পেরেশানি নেই।
ঠাণ্ডা মিয়া জানান, বুধবার তিনি লালবাগের হাট থেকে ৭৪টি গরু কিনেছেন। এর মধ্যে দুই ট্রাক গরু চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছেন। বাকি গরু আবাসিক হোটেলে রেখেছেন। পরে সেগুলো ট্রাক লোড করে পাঠাবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন হাট থেকে আরও গরু কিনবেন। যেগুলো ট্রাকে পাঠাতে পারবেন সেগুলো পাঠিয়ে দেবেন, বাকিগুলো হোটেলে রাখবেন।
গরুর আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপনায় খুবই খুশি বেপারী ঠাণ্ডা মিয়া।
নোয়াখালীর মাইজদী থেকে আসা বেপারী আখতারুল ইসলামও জানান একই প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, এমন হোটেল মাত্র একটি হওয়ায় এর ওপর বেশি চাপ পড়ে। এমন একাধিক হোটেল থাকলে ভাল হতো।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ডা. আব্দুল হাই সরকার বলেন, গরুর আবাসিক হোটেলের আইডিয়াটা খুবই ভালো। রংপুর অঞ্চলের বাইরের ক্রেতারা এখানে নিরাপত্তার সাথে গরু রাখতে পারছেন। এতে বেপারীদের ভোগান্তি কমছে, নিরাপদে তারা বেশি গরু কিনতে পারছেন।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের আবাসিক হোটেল আরও বেশি হলে বাইরের বেপারীরা আরও বেশি গরু কিনবেন। এজন্য আরও হোটেল স্থাপনের জন্য ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হোসেন বলেন, প্রতিটি বড় হাটের পাশে এমন হোটেল হওয়া উচিত।
তিনি জানান, শুধু কোরবানির মওসুমেই উত্তরের ১৬ জেলার ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি গরু বেচাকেনা হয়। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি গরু যায় উত্তরাঞ্চলের বাইরে। নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করে গরুর আবাসিক হোটেল খাতে বিনিয়োগ করে ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারেন।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম জানান, কেউ গরুর আবাসিক হোটেল করতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।


