১৯৯৪ সালের এক তপ্ত গ্রীষ্ম। ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বিশ্বকে দেখানোর মতো নিজেদের কোনো পেশাদার লিগই নেই তাদের! সাবেক কলেজ ফুটবলার আর এদিক-ওদিক খেলে বেড়ানো অপেশাদার বুটজোড়া জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে গড়া হয়েছিল জাতীয় দল। আয়োজকদের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ-টিকিট আদৌ বিক্রি হবে তো? বিশ্ব মাতানো যে খেলা, তা তখন মার্কিন মুলুকে কেবলই শহরতলির অলস শনিবারের সকালের বিনোদন।
সেই আমেরিকা এখন অতীত। দীর্ঘ ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ যখন আবার মার্কিন মুলুকে ফিরছে, তখন এখানকার ফুটবলের চেনা পরিমণ্ডলটাই বদলে গেছে। অতীতের সেই ধূসর ছবির সঙ্গে আজকের ঝলমলে বাস্তবতার কোনো মিলই নেই। ঢিমেতালে চলা সেই ফুটবল আজ রূপ নিয়েছে ‘মেজর লিগ সকার’ বা এমএলএস নামক এক বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্যে। ৩০টি দলের এই টুর্নামেন্টে ২২টি ক্লাবেরই রয়েছে নিজস্ব ফুটবল স্টেডিয়াম। আর গ্যালারিতে প্রতি ম্যাচে গড় দর্শক উপস্থিতি অন্তত ২০ হাজার!
ইউএস সকারের সাবেক সভাপতি সুনীল গুলাতি সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘আমরা যদি ১৯৯৪ সালেও ভাবতাম যে এমএলএস একদিন ৩০ দলের লিগ হবে, দলগুলোর নিজস্ব স্টেডিয়াম থাকবে আর গ্যালারিতে ২০ হাজার দর্শক চিৎকার করবে—তবে সেটাকে স্রেফ অলীক কল্পনা মনে হতো।’
পর্দার পেছনের সেই শর্ত
এই রূপকথার শুরুটা হয়েছিল পর্দার পেছনের এক কূটনৈতিক চালে। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার দেওয়ার পেছনে একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন–বিশ্বকাপের পর দেশটিতে অবশ্যই একটি প্রথম সারির পেশাদার ফুটবল লিগ চালু করতে হবে।
ঝুঁকিটা ছিল আকাশচুম্বী। কারণ, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক পেশাদার লিগ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সত্তরের দশকে পেলে বা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের মতো কিংবদন্তিদের এনে যে ‘নর্থ আমেরিকান সকার লিগ’ (এনএএসএল) আলোড়ন তুলেছিল, ১৯৮৪ সালে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ আমেরিকান কোনো না কোনো স্তরে ফুটবল খেললেও, তাদের সামনে কোনো পেশাদার ভবিষ্যৎ ছিল না।
সাবেক এনএএসএল তারকা ও বর্তমান ফুটবল সংগঠক ফারুক কুরাইশি বলেন, ‘ফিফা অনেক আগেই বুঝেছিল ফুটবলের বিশ্বায়নের জন্য মার্কিন বাজার ধরাটা জরুরি। কারণ, এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক অর্থনীতি। আজ যদি দেখেন কারা এমএলএস-এর ক্লাবগুলো কিনছেন, তবে দেখবেন তারা সবাই আমেরিকার মূল ধারার খেলা এনএফএল-এর নামীদামি ধনকুবের মালিক।’
বেকহ্যাম থেকে মেসি: তারকার মেলা
সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে রেকর্ড গড়েছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। ৫২টি ম্যাচে মাঠে এসেছিলেন প্রায় ৩৬ লাখ দর্শক। সেই সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে এমএলএস।
শুরুটা মন্থর হলেও পরের গল্পটা ঝড়ের গতিতে এগিয়েছে। ১৯৯৯ সাল থেকে কেবল ফুটবলের জন্যই আধুনিক স্টেডিয়াম তৈরি হতে থাকে। এরপর ডেভিড বেকহ্যাম, থিয়েরি অঁরি, জলাতান ইব্রাহিমোভিচ এবং অতি সম্প্রতি ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির আগমনে দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। এমএলএস এখন আর তারকাদের অবসরের আগের চারণভূমি নয়, বরং খেলার মূল আকর্ষণ। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ৫০টি ফুটবল ক্লাবের মধ্যে ১৮টিই খেলছে এই এমএলএস-এ!
মুদ্রার ওপিঠ: মাঠের সাফল্য বনাম গ্ল্যামার
ঝলমলে গ্যালারি আর বিলিয়ন ডলারের ঝনঝনানির আড়ালে অবশ্য একটা চোরা স্রোতও বইছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা এরিক উইনাল্ডার মতে, ফুটবলের পরিকাঠামো বাড়লেও মাঠের খেলার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা কখনো প্রতিভা তৈরি করতে পারে না। আমাদের জেতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমরা খেলোয়াড়দের বলি যে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়। আর তারপর আন্তর্জাতিক মঞ্চে হেরে গেলে অবাক হই!’
আর্থিক বৈষম্যও একটা বড় কারণ। এমএলএস-এ খেলা সিংহভাগ মার্কিন খেলোয়াড় লিগের সর্বনিম্ন বার্ষিক বেতন (৮০ হাজার ৬২২ ডলার) পান। গত বছর লিগের শীর্ষ ৪০ জন সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারের মধ্যে মার্কিন নাগরিক ছিলেন মাত্র দুজন। উইনাল্ডার মতে, ফুটবলে আসল উত্তেজনা আনতে ইউরোপের মতো দল উন্নীতকরণ ও অবনমনের নিয়ম চালু করা উচিত। যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার মডেলের কারণে নিকট ভবিষ্যতে তা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
রাজার আসন না মিললেও, ফুটবল এখন ঘরের ছেলে
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফুটবলার ও বর্তমান জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার অ্যালেক্সি লালাস অবশ্য পুরো বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তিনি বললেন, ‘ফুটবল হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ক্রীড়াজগতের মুকুটহীন রাজা হতে পারেনি। কিন্তু এটি এখন এ দেশের মানুষের পছন্দের তালিকায় পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে। নিশ্চিতভাবেই, বর্তমান প্রজন্মের হাত ধরে ফুটবল আজ আমেরিকার বুকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে।’


