‘মেধাবীরা যখন মানবিক হন, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়’– এমন মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেন, অসুস্থ মানুষ দিয়ে কখনো সুস্থ সমাজ গঠন সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসক ও নার্সদের মানবিক সেবা একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও নার্সিং কলেজের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন ও শিরাবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নার্সিং সাব-কমিটির চেয়ারম্যান কামরুন নাহার দস্তগীরের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কার্যনির্বাহী কমিটির প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল মান্নান রানা, জয়েন্ট জেনারেল সেক্রেটারি মো. জাহিদুল হাসান, ট্রেজারার অধ্যক্ষ লায়ন মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, পরিচালক (প্রশাসন) মো. নূরুল হক ও উপপরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইনসহ অন্যান্যরা।
অনুষ্ঠানের আগে জেলা প্রশাসক হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিট পরিদর্শন করেন। তিনি বহিঃবিভাগ ও শিশু বহিঃবিভাগে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এনআইসিইউ পরিদর্শনের সময় হেড অব ডিপার্টমেন্ট ওয়াজির আহমেদের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ জানতে চান। এ ছাড়া তিনি পিআইসিইউ, এডাল্ট আইসিইউ, ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও অটিজম ইউনিট পরিদর্শন করেন।
ক্যানসার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেলা প্রশাসক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অটিজম ইউনিট পরিদর্শনকালে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বলেন, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে বাবা-মার জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে প্রথমবারের মতো এই মা ও শিশু হাসপাতালে এসে আমি সত্যিই অভিভূত। এখানে আসার আগে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে আমার মনে যে ধারণা ছিল, এখানে এসে তা পুরোপুরি বদলে গেছে। এত সুন্দর পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। সেই বাংলাদেশে নার্সরা মানবতার দেবদূত হিসেবে কাজ করবেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হলেও মানবিকতা ছাড়া সেই শ্রেষ্ঠত্বের কোনো মূল্য নেই।’
ডিসি জাহিদ বলেন, ‘আমরা কোনো দানব নই, আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নই। আমরা অসুস্থ হই, আমরা সেবা নেওয়ার জন্যই হাসপাতালে আসি। তখন নার্সরাই হাসিমুখে সেবা দিয়ে আমাদের সুস্থ করে তোলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সূর্যের যদি তাপ না থাকে তাহলে যেমন সূর্যের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সমুদ্রের গর্জন না থাকলে যেমন সমুদ্রের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি মানুষের মধ্যে যদি মানবিকতা না থাকে তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের দাবিও অর্থহীন হয়ে যাবে।’
জেলা প্রশাসক বলেন, রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তি ও সাহস ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও নার্সদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি ভালো ব্যবহার কিংবা আন্তরিক হাসি একজন রোগীর সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাপী নার্সিং পেশার চাহিদার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশেষ করে ইউরোপ ও জাপানে দক্ষ ও মানবিক নার্সের ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বর্তমানে কিডনি রোগ, অটিজমসহ বিভিন্ন জটিল রোগ বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক বলেন, খাদ্যাভ্যাস, পানি ও পরিবেশ নিয়ে অসচেতনতার কারণে নানা রোগ বাড়ছে। এ বিষয়ে সচেতন না হলে ভবিষ্যতে হাসপাতালের বেডই মানুষের জীবনের বড় অংশ হয়ে যেতে পারে।
এর আগে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস উপলক্ষে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয়। পরে নবাগত শিক্ষার্থীদের শপথ বাক্য পাঠ করানো এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাপ পরিয়ে দেওয়া হয়।


