গত এক শতাব্দীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন প্রযুক্তির সুবিধা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রযুক্তি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও স্থানীয় প্রয়োজনের উপযোগী হওয়ার পরই তারা এর সুফল নিতে পেরেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেই পুরোনো ধারাকে বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এ বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন একটি বিরল সুযোগ দিয়েছে, যার মাধ্যমে কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতি কয়েক বছরের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরি করার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না, বরং সাশ্রয়ী ও স্থানীয় সমস্যা সমাধানে উপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করাই হতে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় সুযোগ।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে, যখন উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল গড় প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারগুলো যদি বিদ্যুৎ অবকাঠামো, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় দ্রুত বিনিয়োগ করে, তাহলে ২০২০-এর দশকের শেষ নাগাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নশীল অর্থনীতির সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, এবং তাদের এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে,’ বলেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো বিপুল বিনিয়োগ করে সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরি করা জরুরি নয়।
তাদের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে নিজেদের ভাষা, বাজার ও স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে।
কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কার চেয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় সম্ভাবনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বর্তমানে থাকা চাকরির মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে আরও কার্যকর ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই সম্ভাব্য হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল শক্তি মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো।
চিকিৎসকের রোগ নির্ণয় আরও নির্ভুল করা, কৃষকের ফসল উৎপাদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত উন্নত করা, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান করা, উদ্যোক্তাদের বাজার বিশ্লেষণে সহায়তা করা এবং সরকারি সেবা দ্রুত ও কার্যকর করা—এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সরকারি খাতেও এর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর আদায় ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবা সম্প্রসারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকর হতে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, দুর্বল অবকাঠামো ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না।
অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা, স্থানীয় ভাষার তথ্যভান্ডার এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।
এসব ভিত্তি তৈরি না হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পক্ষপাত এবং জনআস্থার মতো বিষয়েও নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক সরকারগুলোকে তিন ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছে—প্রথমে বিদ্যমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গ্রহণ, এরপর স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার উপযোগী করা এবং সবশেষে উন্নত প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা অর্জন। ‘সঠিক পথে এগোনোর সুযোগের সময়সীমা খুব সীমিত,’ বলেন ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এর পরিচালক গৌরব নায়ার।
তার মতে, যেসব দেশ এখন বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে, তারাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নত সরকারি সেবায় রূপান্তর করতে পারবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি।
সাব-সাহারা আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিদ্যালয়ে স্থিতিশীল ইন্টারনেট সুবিধা নেই।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও অংশীদাররা মিশন ৩০০ উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ওই অঞ্চলের ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহারের জন্য কম্পিউটিং সুবিধা বাড়ানো, স্থানীয় ভাষার তথ্যভান্ডার তৈরি, প্রযুক্তি প্রকল্প মূল্যায়নের ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের জন্য নীতিমালা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়েনি, বরং এই প্রতিযোগিতা এখনো শুরু হয়েছে।
সাফল্য নির্ভর করবে কে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে তার ওপর নয়, বরং কে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি সবচেয়ে দ্রুত তৈরি করতে পারবে, তার ওপর।


