এবার প্রকাশ্যে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম।
তিনি বলেন, ‘দেশের প্রেসিডেন্ট, যিনি সার্বক্ষণিক কড়া নিরাপত্তা চাদরে ঘেরা থাকেন, তার সঙ্গেই যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে আমাদের দেশের অন্য নারী এবং মেয়ে শিশুদের সঙ্গে কী ঘটতে পারে? কোনো পুরুষেরই নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।’
এরইমধ্যে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে মেক্সিকো সিটি পুলিশ। তার নাম উরিয়েল রিভেরা। তাকে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার জাতীয় প্রাসাদে বৈঠক শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পথে সাধারণ জনগণের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন শেইনবাউম। এসময় মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি তার শরীরের স্পর্শকাতর অংশে স্পর্শ গায়ে হাত রাখেন এবং চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন।
তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় শেইনবাউম তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন এবং পরে তার এক সহকারী ওই ব্যক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আড়াল করেন।
মুহূর্তেই দেশের প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে হয়রানির ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে। ওই ভিডিও-তে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে শেইনবাউমের নিরাপত্তা দলের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
অভিযোগ দায়েরের পর বুধবার মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট জানান, তাকে অপ্রীতিকরভাবে স্পর্শকারী ওই ব্যক্তি মাতাল অবস্থায় ছিলেন। তার কোনো হিতাহিত জ্ঞান ছিল না।
ভাইরাল ভিডিও ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অবস্থান
শেইনবাউমকে হয়রানির ওই ভাইরাল ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করলে এ বিষয়েও উদ্বেগ জানান শেইনবাউম। পরে কিছু একাউন্ট থেকে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপরও চটকদার শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে দেশটির একাধিক সংবাদপত্র। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্টসহ মেক্সিকোর নারীদের নিরাপত্তাহীনতা ও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির গভীরতা তুলে ধরা হয়।
মেক্সিকোর সংবাদপত্র রেফর্মা ওই ঘটনার স্পষ্ট ছবি প্রকাশ করায় তার তীব্র সমালোচনা করেন শেইনবাউম। তিনি একে ‘পুনঃনিপীড়ন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই ছবিগুলির ব্যবহারও একটি অপরাধ। এটি নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছে। আমি সংবাদপত্রটির কাছ থেকে ক্ষমা প্রত্যাশা করছি।’
তার ফেডারেল সরকারের নারী মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে নারীদের প্রতি যেকোনো সহিংসতার ঘটনায় অভিযোগ দায়েরের আহ্বান জানায়। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে ‘নারীর মর্যাদা লঙ্ঘন করে এমন বিষয়বস্তু প্রচার না করতে’ অনুরোধ করে।
এতে অবশ্য দেশটির অনেক নারীবাদীই শেইনবাউমের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এই ধরনের ভিডিও আরও বেশি ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন। কারণ, এই একটি ভিডিওই মেক্সিকোতে নারীর নিরাপত্তাহীনতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তারা আরও অভিযোগ করেন, শেইনবাউম নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীর অনুপস্থিতি
ভাইরাল ভিডিওতে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারক্ষীদের অভাব স্পষ্ট। এতে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির জনগণ। শেইনবাউমের পূর্বসূরি আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেস ওব্রাদর জানান, দেশটির সাবেক নেতাদের মতো তিনিও খুব সীমিত নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করেন। তিনি প্রায়ই উপস্থিত সাধারণ জনগণের সঙ্গে করমর্দন করতে এবং ছবি তুলতে পছন্দ করেন।
শেইনবাউম জানান, তিনি জনগণের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য খুবই কম সময় পান। কাজেই জনগণের কাছাকাকছি থাকতে চলাফেরার সময় স্বল্প সময়ের আলাপচারিতার এই নীতি তিনি পরিবর্তন করবেন না।
যৌন হয়রানিকে ‘আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানিয়ে নারীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় দেশের নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি রাজ্যের আইন পর্যালোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মেক্সিকোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মেক্সিকোতে ৮২১টি ফেমিসাইড (নারীর প্রতি সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড) রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সে সংখ্যা ৫০১। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।


