গত ১৭ জুন একটি কাঠের বইয়ের তাকের সামনে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিতে সই করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ হিসেবে প্রশংসা পাওয়া এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। একই সাথে এটি ছিল ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে চালানো কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক চেষ্টার একটি বড় সাফল্য।
কিন্তু এক মাসও পার হয়নি, সেই সব চেষ্টা এখন পুরোপুরি ভেস্তে গেছে বলে মনে হচ্ছে। আল জাজিরার খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সেই চুক্তি যখন ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, ঠিক তখনই নতুন করে শুরু হওয়া মারামারি-হানাহানি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দুটি বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত সোমবার সকালে আমেরিকা ইরানে নতুন করে হামলা চালায়। জবাবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় ও আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়। ইরানের দাবি, এই দেশগুলোতেই আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, পাকিস্তান, কাতার ও ওমান এখনো ঝামেলা মেটানোর চেষ্টা করছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, যুক্তরাষ্ট্র জুনের চুক্তি অমান্য করায় ইরানও পাল্টা জবাব দেওয়া চালিয়ে যাবে।
এখন পর্যন্ত এই শান্তি চেষ্টা যুদ্ধ থামাতে পারেনি। গত রোববার পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে ফোনে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আলোচনাই একমাত্র সমাধানের পথ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে সাবধান করে বলেছেন, অনেক কষ্ট করে যে শান্তি এসেছিল তা এখন নষ্ট হতে বসেছে। অন্যদিকে, ইসহাক দার আলাদাভাবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সাথেও ফোনে কথা বলেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন আসল প্রশ্ন হলো—দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস যেভাবে বেড়েছে, তাতে পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ কি আদৌ ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আবার মুখোমুখি বসাতে পারবে?
বারবার চুক্তিভঙ্গ
গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এই নিয়ে অন্তত তিনবার শান্তি চুক্তি ভাঙল। সেই প্রথম যুদ্ধবিরতির মাত্র কয়েকদিন পরেই ইসলামাবাদে হওয়া আলোচনা ভেস্তে যায়। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ করে এবং দুই দেশ একে অপরের জাহাজে পাল্টা হামলা শুরু করে।
১৭ জুনের সমঝোতা চুক্তির পরও ইরান আবারও কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, জাহাজগুলো অনুমতি ছাড়া তাদের জলসীমায় ঢুকেছিল। এ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। গত সপ্তাহের তেলবাহী জাহাজে হামলার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের ১০টি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন সৈন্য, হরমুজগান প্রদেশের কয়েকজন জেলে এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী মারা গেছেন। ইরানকে মধ্য এশিয়া ও চীনের সাথে যুক্ত করা একটি রেল সেতু এবং মাশহাদের একটি সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় যাওয়া মানুষেরা ব্যবহার করছিলেন।
এই ঝামেলায় কাতারও জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের মিসাইল ও ড্রোন কাতারে গিয়ে পড়লে দেশটির তিনজন নাগরিক আহত হন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে জুনের চুক্তির প্রায় সব নিয়ম ভেঙেছে। মুখপাত্র বাঘাই বলেন, ইরান ভালো মনেই চুক্তি করেছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কথা না রাখলে ইরানও চুপ করে থাকবে না।
পাকিস্তানের সীমিত ক্ষমতা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসলামাবাদ দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। গত এপ্রিলে তাদের করা বৈঠকের মাধ্যমেই দীর্ঘ ৪০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো একসাথে বসেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার তেহরান সফর করেছেন। এমনকি গত মার্চে চীনের সমর্থনে একটি শান্তি চুক্তি তৈরিতেও পাকিস্তান সাহায্য করেছিল।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে মিলে সমঝোতা চুক্তিতে সই করেছিলেন। পরে সুইজারল্যান্ডের এক সম্মেলনেও এটি নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি মানতে বাধ্য করার মতো কোনো ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। তেহরানের গবেষক জাভেদ হিরান-নিয়া বলেন, এই চুক্তিটি ছিল সাময়িক স্বস্তির জন্য, স্থায়ী কোনো সমাধান এতে ছিল না। আসল সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে চায় না এবং এর জন্য তারা যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেও রাজি।
উপসাগরীয় আন্তর্জাতিক ফোরামের দানিয়া থাফার বলেন, দুই পক্ষই নিজেদের দাবিতে অনড় থাকায় পাকিস্তানের কিছু করার সুযোগ কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান দুই দেশের ওপরই অনেকখানি নির্ভরশীল। কিন্তু ইরান যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালীর দখল ধরে রাখতে চায়।’
তবে ইসলামাবাদের গবেষক কামার চিমা মনে করেন, দুই দেশের সাথেই পাকিস্তানের ভালো যোগাযোগ আছে এবং এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যেভাবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রশংসা করেছেন, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের যথেষ্ট মূল্য রয়েছে।
কূটনীতিতে জটলা, কিন্তু বিরোধ একই
পাকিস্তানই একমাত্র মধ্যস্থতাকারী নয়। হিরান-নিয়া জানান, ইরান এর আগেই হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি পাকিস্তানের হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে ওমানের রাজধানী মাস্কাটের সাথে সরাসরি আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
হামলা ও পাল্টা হামলা বাড়লেও আসল বিবাদ কিন্তু একই জায়গায় আটকে আছে: হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? ইরান মনে করে জুনের চুক্তিতে তাদের এই অধিকার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে নারাজ।
গত সোমবার ট্রাম্প আবার নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেন এবং এই প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক বসানোর কথা বলেন। এর আগে এমন একটি সমাধান খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল যেখানে জাহাজগুলো ইরান ও অন্য একটি উপসাগরীয় দেশের সাথে যোগাযোগ রেখে চলাচল করবে। কিন্তু খামেনির মৃত্যুর পর সেই আলোচনা থমকে যায়।
এরপর থেকে কূটনীতির বদলে সামরিক শক্তি খাটানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হিরান-নিয়া বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দুই পক্ষই নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে হামলা চালিয়ে যাবে। এতে পরিস্থিতি যেকোনো সময় হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।’
তবে দানিয়া থাফার একটি আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো পক্ষই এখনো চুক্তিটি পুরোপুরি বাতিল করেনি। ‘ইরান এই হামলাগুলোকে চুক্তি ভঙ্গ বলছে, চুক্তি থেকে বের হওয়ার অজুহাত বানাচ্ছে না। এর মানে হলো, এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ রয়েছে।’
তবে আপাতত যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই এবং পাকিস্তানের শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।


