জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার তারা জানায়, জর্ডানের মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। একই সঙ্গে জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরিয়ে দিতে দেশটির রাজতন্ত্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আইআরজিসি।
আইআরজিসির বরাতে ফার্স নিউজে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আপনারা ভালোভাবেই জানেন, আপনাদের দেশের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই, আমরা আপনাদের ভালোবাসি। ফিলিস্তিনি জনগণের কষ্ট ও নিপীড়ন অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে বেশি বোঝেন এমন সম্মানিত মানুষ আপনারা।’
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ভূখণ্ড থেকে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা চারটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে নতুন দফা হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম)। মঙ্গলবার দিনের শুরুতে পাঁচ ঘণ্টার এই হামলা ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টানা তৃতীয় রাতের অভিযান।
এর আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ পুনর্বহাল করেন এবং প্রণালিতে নিরাপত্তার জন্য পণ্যবাহী সব জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ আদায়ের প্রস্তাব দেন।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোও মার্কিন অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছে। এসব হামলায় চারজন আহত হয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।
এর আগে সোমবার হিউ হিউইট শো-তে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে সোমবার রাতে “খুব কঠোরভাবে” হামলা চালানো হবে এবং পরদিনও হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরানের কিছুই করার থাকবে না।’
ইরান গত সপ্তাহের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ওয়াশিংটন-তেহরান ফের বড় মাত্রায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এতে যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষের হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে বিশ্ববাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম।
সোমবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি খোলা আছে এবং ইরান থাকুক বা না থাকুক, এটি খোলা থাকবে। আমরা ইরানের ওপর অবরোধ পুনর্বহাল করছি।’
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ‘হরমুজ প্রণালির রক্ষক’ হিসেবে পরিচিত হবে এবং ন্যায্যতার স্বার্থে এই পথে পরিবহন হওয়া সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে অর্থ ফেরত পাবে।
তবে ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, এই নৌপথের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘তেহরানই হরমুজ প্রণালির রক্ষক এবং “চিরকাল” তা থাকবে।’
ট্রাম্পের ২০ শতাংশ অর্থ আদায়ের প্রস্তাবের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০ শতাংশ অবশ্যই অনেক বেশি। তবে আমরা ন্যায্য থাকব।’
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার গ্রিনিচ সময় রাত ৮টা থেকে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর হবে। এই অবরোধের আওতায় পতাকা নির্বিশেষে সব ধরনের জাহাজ চলাচল থাকবে এবং ইরানের পুরো উপকূল, বন্দর ও তেল টার্মিনাল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরান ছাড়া অন্য দেশের গন্তব্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরপেক্ষভাবে চলাচলের অধিকার এই পদক্ষেপে বাধাগ্রস্ত হবে না। মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলো পরিদর্শনের শর্তে চলাচলের অনুমতি পাবে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এর মাধ্যমে প্রতিদিন এক কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছাত, যার মূল্য ছিল অন্তত ১২০ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ২০ শতাংশ অর্থ আদায় করে, তাহলে ওয়াশিংটন প্রতিদিন প্রায় ২৪ কোটি ডলার আয় করতে পারে।
তবে জাতিসংঘের নৌ চলাচল সংস্থা ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিতে কোনো ধরনের অর্থ আদায়ের বিরোধী তারা এবং এ ধরনের বাধ্যতামূলক শুল্ক আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশ দিয়ে ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় ইরানের ছোড়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি আমিরাতের তেলবাহী জাহাজে আঘাত হেনেছে।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জানিয়েছে, ওমানের কালহাত এলাকার ৪০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে চলাচলকারী একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত করেছে।
তবে যুক্তরাজ্যের ওই সংস্থার প্রতিবেদন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জানানো ঘটনার মধ্যে একই ঘটনা কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে দুটি ‘আক্রমণাত্মক’ সুপার ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করা হয়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজ দুটি বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল এবং তাদের নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। বিবৃতিতে জাহাজগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং এগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উল্লেখ করা একই জাহাজ কি না, তাও জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আইআরজিসি বলছে, তারা জাহাজগুলোকে ‘অবৈধ পথে’ চলাচলে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিয়েছে, ‘আগ্রাসী শত্রুর’ সঙ্গে সহযোগিতা করলে ক্ষয়ক্ষতি, নৌপথ পুনরায় চালুতে বিলম্ব এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।


