রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আরও একবার যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘কিয়েভ ও মস্কোর প্রতি আহ্বান- যথেষ্ট রক্ত ঝরেছে, যুদ্ধ আর প্রাণের দামে দেশের সীমানা নির্ধারিত হচ্ছে। এখনেই সব থেমে যাক। উভয় পক্ষই জয় দাবি করুক, ইতিহাস জয়ী নির্ধারণ করবে!’ পরে জেলনস্কিও তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
বার্তা সংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, এর মধ্য দিয়ে তিনি ফের ইউক্রেনকে ‘যুদ্ধে রাশিয়ার কাছে হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধারের’ চেষ্টা থেকে বিরত থাকার ইঙ্গিত দিলেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের এই অসন্তোষ নতুন নয়। জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তিনি এই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন।
জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক শেষে ফ্লোরিডায় পৌঁছে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুদ্ধ যেখানে চলছে, সে মাত্রা আর না বাড়িয়ে থেমে যেতে হবে; না হলে বিষয়টা অত্যন্ত জটিল হবে। সবাই নিজ নিজ বাড়ি ফিরে যাক, পরিবারে ফিরে যাক, হত্যা বন্ধ হোক— এভাবেই যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত।’
এই মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প ফের ইউক্রেন যুদ্ধে তার অবস্থান পরিবর্তন করলেন। এর আগে গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জেলেনস্কির সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেন চাইলে সব হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

অবশ্য এবার ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সম্মতি দিয়েছেন জেলেনস্কিও। শুক্রবারের বৈঠকের পর তিনি বলেন, ‘এখন যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সময় এসেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন। আমাদের যেখানে আছি সেখানেই থামতে হবে, তারপর কথা বলতে হবে।’
ট্রাম্পের অবস্থানে এই পরিবর্তনের পেছনে গত বৃহস্পতিবার রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ওই ফোনালাপে ওয়াশিংটন-মস্কো কূটনৈতিক সম্পর্কে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ টেলিফোন আলোচনার পর, দুই সপ্তাহের মধ্যে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ওই ফোনালাপের পরই জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘টমাহক’ সরবরাহ করতে অনিচ্ছা জানান তিনি। অবশ্য কিয়েভের মতে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষেপণাস্ত্রই মস্কোকে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার টেবিলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জেলেনস্কিও তাই বৈঠকের শুরুতেই প্রস্তাব দেন, ট্রাম্প ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র দিলে, কিয়েভ ওয়াশিংটনকে উন্নতমানের উন্নত ড্রোন সরবরাহ করবে। তবে সে প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই সবাইকে নিশ্চিত করতে চাই, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে সব ধরনের অস্ত্র মজুদ আছে। কখন কী হয় বলা যায় না। কাজেই আমরা প্রতিরক্ষায় পরিপূর্ণ। আমাদের কারও কাছে থেকে নতুন অস্ত্র কেনার প্রয়োজন নেই। আবার আমরা এটিও চাই না- ইউক্রেনের “টমাহক” লাগুক। বরং চাই, যুদ্ধটা শেষ হোক।’
এদিকে পুতিন ‘যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার’ নামে কেবলই সময়ক্ষেপণ করছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা সম্ভব, তবে আমি জানি কীভাবে এসব সামলাতে হয়। আমি জীবনে সবসময় সেরা লোকদের সঙ্গেই লড়াই করেছি এবং ভালোভাবেই জয়ী হয়েছি। আমি মনে করি, এসব বিষয়ে আমি বেশ পারদর্শী।’
হোয়াইট হাউসে এটি ছিল ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে পঞ্চম মুখোমুখি বৈঠক। এর আগের প্রায় প্রতি বৈঠকের মতো এবারও জেলেনস্কিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এমনকি আসন্ন বুদাপেস্ট বৈঠকে ট্রাম্প-পুতিনের সঙ্গে তিনিও আমন্ত্রণ পাবেন কিনা সেটিও নিশ্চিত নয়। জেলেনস্কি বলেন, ‘এই দুই নেতা (ট্রাম্প-পুতিন) এমনিতেই একে অপরকে পছন্দ করেন না। তাই সবার জন্য আরামদায়ক একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিনের প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। তারা আমাদের দেশকে আক্রমণ করেছে, তাই তারা আমাদের দেশের শত্রু। ওদের থামার কোনো ইচ্ছা নেই।’


