উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলোর মধ্যে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার জয়গঞ্জ জমিদার বাড়ি অন্যতম। প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বছর আগেকার ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হয় বা এর প্রতিষ্ঠাতা কে, সেসব সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো অজানা। তবে ভারতবর্ষের জমিদারী প্রথা থাকা অবস্থাতেই এটি তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এক সময়ের আড়ম্বরপূর্ণ এই পুরাকীর্তিটি বর্তমানে অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখনও ইতিহাসখ্যাত বাড়িটি দেখতে আসেন। কিন্তু সেখানে এখন দেখার মতো তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। গরু-ছাগলের চারণভূমি আর আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে জায়গাটি।
খানসামা সদর থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে আত্রাই নদীর তীরে আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের জয়গঞ্জ গ্রামে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি স্থানীয়ভাবে খানসামা জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। অনেকে এটিকে খানসামার জয়শঙ্করের জমিদার বাড়ি এবং জয়গঞ্জ জমিদার বাড়ি হিসেবেও চেনে। এই বাড়ির শেষ জমিদার জয়শঙ্কর রায় চৌধুরীর নামানুসারেই গড়ে উঠেছিল বর্তমান জয়গঞ্জ বাজার।
সরেজমিন দেখা যায়, জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই একতলা প্রাসাদটির দেওয়ালে সূক্ষ্ম নকশা ও ইটগুলো ধীরে ধীরে খসে পড়ছে। দু’টি দালানের মধ্যে একটি আগেই ভেঙে গেছে, আর অক্ষত অন্য দালানটিও ধ্বংস হতে বসেছে। প্রাসাদের ভেতরে একসময় থাকার ঘর, বসার ঘর, মালামাল রাখার ঘর ও মন্দির থাকলেও, বর্তমানে সবকিছুরই ভগ্নদশা। শুধু তাই নয়, জমিদার বাড়ির অনেক মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির তিনটি পুকুর, বর্তমানে জমিদার বাড়ির চারপাশে সরকারিভাবে গড়ে ওঠা ‘আদর্শগ্রামের’ বাসিন্দারা ব্যবহার করেন। পুকুর ও জমি ব্যবহার হলেও জমিদার বাড়িটির দিকে কারো ন্যূনতম নজর নেই।
জানা যায়, জমিদার জয়শঙ্কর সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করতেন। একসময় দিনাজপুরের রাজা দেবত্তর জয়সঙ্করকে পরাজিত করে এখান থেকে বিতাড়িত করেন। দেশভাগের আগেই জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে শেষ জমিদার জয়শঙ্কর প্রায় ১০০ একর জমি ও জমিদার বাড়িটি রেখে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যান। এই বিশাল সম্পত্তির কিছু অংশ এখন ব্যক্তি মালিকাধীন এবং কিছু অংশ সরকারি খাস জমিতে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসের এক প্রাচীন সাক্ষী, এই জয়শঙ্কর রায় চৌধুরীর জমিদার বাড়িটি বাঁচাতে এলাকাবাসী এখন সরকারের সহযোগিতা কামনা করছেন। তাদের দাবি, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই পুরাকীর্তিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে এই বাড়িকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।


