সবুজবাগ থেকে রোববার সকালে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) এসেছিলেন ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আকবর এলাহী। তার স্ত্রী স্নায়ুরোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। তবে নির্ধারিত ওয়ার্ডে শয্যা না পাওয়ায় আকবর ও তার পরিবারের ভাগ্যে জুটেছে ওয়ার্ডের বাইরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
আকবর বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসা পাওয়া। প্রয়োজনে মেঝেতে থেকেও আমরা সেবা নেব।’
আকবরের অভিজ্ঞতা দেশের অন্যতম ব্যস্ত সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র। নিয়মিতই এখানে চিকিৎসা নিতে আসা ও ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢামেকে দুই হাজার ৬০০টি শয্যা রয়েছে। তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার হাজার রোগী ভর্তি হন। কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা বেড়ে সাড়ে চার হাজার জন পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীরা মেঝে, বারান্দা এবং সিঁড়ির পাশেও চিকিৎসা নিচ্ছেন। জরুরি বিভাগেও দেখা গেছে তীব্র চাপ। রোগীদের ভিড়ে করিডোর ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জায়গাগুলো কানায় কানায় পূর্ণ।
স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত সরু পথগুলোতেও ছিল ব্যস্ততা। বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য স্ট্রেচারে করে আনা হচ্ছিল সেই সরু পথে।
হাসপাতালের প্রধান ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের চাপ সামল দিতে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে প্রতিটি শয্যার মাঝে যে পরিমাণ ফাঁকা জায়গা থাকার কথা, তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সেই সীমিত জায়গার মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর শরীরে স্যালাইন প্রবেশ করানোসহ অন্য জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছেন।

এর আগে সরকার ঢাকা মেডিকেল কলেজকে পাঁচ হাজার শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার জন্য একটি বড় প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি আর এগোয়নি। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালটিকে ৪ হাজার শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ঢামেকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। যখন এই হাসপাতালের তুলনায় ভালো বিকল্প ব্যবস্থা থাকে, তখন আমরা রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন জরুরি, যাতে আরও বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া যায়।’
ঢাকা মেডিকেলের ওপর এই অতিরিক্ত চাপ দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় সংকটের অংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ৫৯টি জেলা হাসপাতালে গড়ে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ১৭৮ শতাংশ।
সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই হার ছিল ১৬৪ শতাংশ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিল ১১১ শতাংশ।

২০২৫ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হাসপাতালে সংক্রমণ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, দুর্বল পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব হাসপাতাল-সৃষ্ট সংক্রমণের অন্যতম কারণ।
গবেষণায় আরও বলা হয়, অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, এ বিষয়ে সীমিত সচেতনতা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বড় কারণ।
এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় একীভূত স্বাস্থ্য পদ্ধতি গ্রহণ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার, ব্যবহারের নির্দেশনা কার্যকর করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করার সুপারিশ করেন গবেষকরা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হুসাইন টাইমসকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা জরুরি। তা না হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় আসতেই থাকবে, যা সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়াবে।’
সরকার সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো উন্নয়নের পরিকল্পনা সংশোধন করেছে। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে এসব সেবাকেন্দ্রে প্রস্তাবিত শয্যা সংখ্যা ১০১ থেকে বাড়িয়ে ১৫১ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুশতাক হুসাইন বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে অনেক যন্ত্রপাতি জনবলের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতিও সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনবল সংকট সমাধান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ’
তবে আকবরের স্ত্রীর মতো গুরুতর রোগীদের জন্য চিকিৎসা সংকটের সমাধান ভবিষ্যতের আশায় ফেলে রাখার সুযোগ নেই। কাজেই দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর এই চাপ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।


