মূল্যস্ফীতি আর করনীতিতে কমছে প্রকৃত আয়

মূল্যস্ফীতি আর করনীতিতে কমছে প্রকৃত আয়
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বাড়লেও তারা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। এর ফলে মাস শেষে তাদের হাতে জমানো টাকা আগের চেয়ে কমে গেছে। সাধারণ মানুষ এর জন্য মূলত মূল্যস্ফীতিকেই দায়ী করছেন।

একটি নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি ছাড়াও এর নেপথ্যে কাজ করছে করনীতি। এই কাঠামোর কারণে করদাতাদের প্রকৃত আয় না বাড়লেও তারা দিন দিন উচ্চ করের আওতায় চলে যাচ্ছেন।

বিনিয়োগ বিশ্লেষক এবং বিংহামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তৌকির আজিজ ‘বাংলাদেশের করের চাপ’ (বাংলাদেশ’স ট্যাক্স স্কুইজ) শীর্ষক তথ্যভিত্তিক এক গবেষণায় এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

তিনি জানান, গত এক দশকে মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সঙ্গে কর ব্যবস্থার পরিবর্তন যুক্ত হয়ে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা ক্রমেই বাড়িয়েছে।

২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দেশের কর, মূল্যস্ফীতি, মজুরি এবং মুদ্রার বিনিময় হারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা করা হয়। এতে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়লেও প্রকৃত মূল্যের দিক থেকে তা আসলে কমে গেছে।

২০২৬-২৭ কর বছরের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা আগের বছর ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে ২০১৬ সালের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করলে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর এই সীমা হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যের বিচারে করমুক্ত আয়ের সীমা আসলে প্রায় ২১ শতাংশ কমে গেছে।

এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ নামে অভিহিত করেন। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের বেতন বাড়লেও জীবনযাত্রার মানের কোনো উন্নতি হয় না, অথচ তাকে উচ্চ হারে কর দিতে হয়।

যদি ২০১৬ সালের কর কাঠামোকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা হতো, তবে বর্তমানে ১৫ শতাংশ করের হার শুরু হতো বার্ষিক ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে, যা এখন শুরু হচ্ছে মাত্র ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে।

একইভাবে ২০, ২৫ এবং ৩০ শতাংশ করের স্তরের জন্য মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত সীমা হওয়া উচিত ছিল যথাক্রমে ২১ লাখ ৭০ হাজার, ৩৩ লাখ ১০ হাজার এবং ৮৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে এই সীমাগুলো রয়েছে যথাক্রমে ১০ লাখ ৭৫ হাজার, ১৫ লাখ ৭৫ হাজার এবং ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

তা ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বনিম্ন আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ করে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যেক করদাতার বার্ষিক করের পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি, করের স্তরে সীমিত সমন্বয় এবং ভ্যাট-নির্ভর রাজস্ব মডেলের কারণে চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমছে।

আরও পড়ুন

তিনি আরও জানান, মানুষের মজুরি বাড়লেও খাদ্য, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত খরচ যেভাবে তীব্র গতিতে বেড়েছে, তাতে প্রকৃত আয় আসলে থমকে গেছে বা কমে গেছে। করের সীমা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি অনেক কর্মীকে উচ্চ করের আওতায় নিয়ে যাচ্ছে। অথচ তাদের জীবনযাত্রার মানের কোনো বাস্তব উন্নতি হচ্ছে না।

এই গবেষণায় একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ২০১৬ সালে একজন কর্মী মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় করলে বর্তমানে একই ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে তার প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা প্রয়োজন। এখন ওই কর্মী প্রকৃত আয়ের দিক থেকে আগের অবস্থানেই আছেন, কিন্তু কর কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে তার করের হার ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশ হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক বাজেটগুলোর পরিবর্তন কার্যকর করের হার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাসে দেড় লাখ টাকা আয় করা একজন ব্যক্তির কার্যকর করের হার ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছিল। কিন্তু নতুন বাজেটে তা বেড়ে প্রায় ১৪ শতাংশ হচ্ছে। একইভাবে মাসে ৮০ হাজার এবং ৫০ হাজার টাকা আয় করা করদাতাদের কার্যকর করের হার বেড়ে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৪ শতাংশ হচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গত এক দশকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি হারের তথ্য ব্যবহার করে দেখা গেছে, কার্যকর করের হার বাড়লেও মানুষের প্রকৃত মজুরি কমেছে। মাসে দেড় লাখ টাকা আয়ের সমপরিমাণ উপার্জনকারী একজন করদাতার কার্যকর করের বোঝা ২০১৬ সালের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।

বাজেটে ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত করের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মূল্যস্ফীতির হারকে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম ধরা হয়েছে। গত তিন বছরে গড় মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিল, সেখানে বাজেটের ধারণায় সর্বনিম্ন কর স্তরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ স্তরের জন্য মাত্র শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ ধরা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি যদি এভাবে উচ্চ স্তরেই থেকে যায়, তবে কর সীমার প্রকৃত মূল্য আরও কমতে থাকবে এবং সাধারণ মানুষ আরও বেশি উচ্চ করের ফাঁদে পড়বেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়কর এই বোঝার একটি অংশ মাত্র। বাংলাদেশ মূলত ভ্যাট এবং অন্যান্য পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভর করে, যা মানুষের আয় বিবেচনা না করেই সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। ২০২৫ সালে ওষুধ, গুঁড়ো দুধ, বিস্কুট, কেক, ফলের রস, সাবান, ডিটারজেন্ট, টয়লেট টিস্যু এবং প্যাকেটজাত খাবারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, এ ধরনের কর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ, তারা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ এই পণ্যগুলো কিনতেই ব্যয় করে ফেলেন।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার অন্য একটি চাপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের উচ্চ শুল্ক ও আধা-শুল্ক ব্যবস্থা গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সুরক্ষামূলক আমদানি শুল্ক ৫৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কারণে ভোক্তাদের প্রতি বছর আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

অথচ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার প্রায় ৭ শতাংশ এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তা মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০০০ সাল থেকে এই সুরক্ষামূলক কাঠামো আরও জোরদার করা হয়েছে, যা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পথের সঙ্গে দিন দিন অমিল তৈরি করছে।

তৌকির আজিজ বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের তুলনাও করেছেন। ভারতে করমুক্ত আয়ের সীমা এবং রেয়াত সুবিধা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে বার্ষিক ১২ লাখ রুপি বা প্রায় ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে রেয়াতের মাধ্যমে কার্যকরভাবে কোনো আয়কর দিতে হয় না।

ডলারের হিসাবে ভারতের করমুক্ত আয়ের সীমা ২০১৬ সালের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এই সীমা প্রায় ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছিই আটকে আছে।

এর সঙ্গে মুদ্রার অবমূল্যায়নও মানুষের কষ্ট বাড়িয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা তার মূল্যের প্রায় ৫৬ শতাংশ হারিয়েছে। এর বিপরীতে ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশের মতো। টাকার এই দরপতনের ফলে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস, ব্র্যাকেট ক্রিপ, পরোক্ষ কর এবং উচ্চ বাণিজ্য সুরক্ষার মতো বহুমুখী চাপের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই সব কটি কারণ একত্রে মিলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও পরিবারের সঞ্চয়ের ক্ষমতা নষ্ট করছে।

অধ্যাপক সেলিম রায়হান এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, করের স্তরগুলোকে নিয়মিত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা, করমুক্ত আয়ের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা, প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো এবং ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার মধ্যে এর সমাধান রয়েছে।

এর পাশাপাশি উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর দেওয়া নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এটি কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত করবে এবং সাধারণ করদাতাদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের সংস্কার না করা হলে আগামী দিনগুলোতে মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় আরও কমবে, সঞ্চয় হ্রাস পাবে এবং তাদের আর্থিক মানসিক চাপ ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad