সংগীতের সার্বজনীন শক্তিকে উদযাপন করতে প্রতি বছর ২১ জুন পালিত হয় বিশ্ব সংগীত দিবস। ১৯৮২ সালে ফ্রান্সে শুরু হওয়া এ আয়োজন এখন বিশ্বের শতাধিক দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে। তবে উৎসবের এই আবহের মধ্যেই দেশের সংগীতাঙ্গনকে ঘিরে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উদ্বেগ। শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চার সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, রয়্যালটি বঞ্চনা এবং সংগীত শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন দেশের সংগীত অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।
শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চার ক্রমহ্রাসমান প্রবণতাকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দেখছেন বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম। তিনি বলেন, ‘৩০ বছর ৪০ বছর আগের শিল্পীরা শাস্ত্রীয় সংগীত জানতেন। এখন যারা আসছে তারা তো শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা পাচ্ছে না। তারা মোবাইলে গান শুনে রবীন্দ্র, নজরুল বা পল্লীগীতি শিখছে’।
তিনি আরও মনে করেন, বর্তমানে গানের বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। আগে সমর দাস, আজাদ রহমান বা আলাউদ্দিন আলীর মতো কিংবদন্তিরা যখন সুর করতেন, তখন প্রত্যেকের আলাদা একটি শৈলী থাকত। কিন্তু এখনকার ১০টি গান শুনলে একই রকম মনে হয়। খুরশীদ আলমের মতে, বর্তমানে শিল্পীরা ভালো হলেও তাদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কোনো ‘গার্ডিয়ান’ বা অভিভাবক নেই।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াঙ্কা গোপ এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এআই ধ্বংস করে দিচ্ছে সব। যারা সংগীতজ্ঞ নন, তাদের হাতে ডিভাইস চলে গিয়ে সংগীত ধ্বংস হচ্ছে। আপনি যা লিখে দেবেন, এআই তা দিয়েই গান বানিয়ে দেবে। এআই যখনই মানুষকে ছাপিয়ে চলে যাবে, তখন আর কিছু করার থাকবে না। এখন থেকেই এআই-এর ওপর স্ট্রিকনেস বা একটা লিমিটেশন দেওয়া দরকার।’
ফিউশন সংগীত নিয়ে প্রিয়াঙ্কা গোপের পর্যবেক্ষণ, বিষয়টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে তা অনেক সময় মূল সংগীতধারার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।। তিনি বলেন, ‘গভীর বেদনার গানকে ফিউশন করতে গিয়ে দেখা যায় বিনোদনমূলক গান করে ফেলা হচ্ছে।’ খুরশীদ আলমও এআই-কে সংগীতে এক প্রকার হুমকি হিসেবেই দেখছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গোপ।। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, সংগীত নিয়ে উচ্চশিক্ষার পর কর্মসংস্থানের সঠিক পথ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ে উচ্চতর গবেষণা হচ্ছে বলে জানান।
প্রিয়াঙ্কা মনে করেন, সংগীত কেবল সুরের বিষয় নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞান, গণিত বা মনোবিজ্ঞানের মতো একটি গভীর বিষয়। তিনি প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সংগীত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং অপরাধ প্রবণতা কমানোর জন্য সংগীত শিক্ষার প্রয়োজন।’
সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের জন্য ‘রয়্যালটি’ এখনো অনেকটাই সোনার হরিণ। খুরশীদ আলম বলেন, সাবিনা ইয়াসমিন বা আব্দুল হাদী সাহেবদের মতো সিনিয়র শিল্পীরাও রয়্যালটি পাচ্ছেন না।
বেতার ও টেলিভিশনে শিল্পীদের দেওয়া সম্মানী নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেন খুরশীদ আলম, ‘বেতার বা টেলিভিশনে শিল্পীদের যে সম্মানী দেওয়া হয়, সেটা লজ্জাজনক। যারা গানকে ভালোবাসে তারা কেবল ভালোবাসার টানেই এখনো গান করতে যায়।’
বিশ্ব সংগীত দিবসে দেশের গান, মাতৃভাষার গান, আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের গানকে যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন খুরশিদ আলম। আর প্রিয়াঙ্কা গোপ বলেন, ‘সুর পবিত্র, সেই পবিত্র সুরের সঙ্গে যদি আপনি অপবিত্র কথা জুড়ে দেন তবেই তা অপবিত্র হবে। সংগীত দিবসে আমাদের সবার চাওয়া—সুরের পবিত্রতাকে ভালোবাসুন এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুন।’


