একসময় দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি ছিল ‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট। এই ফসল এখন যেন হারাতে বসেছে তার সেই জৌলুস। দিন দিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও বাড়ছে না পাটের দাম। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের এই ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ নেই কৃষকদের।
উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা এখনো এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল হলেও বছরের পর বছর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাদের মুখে রয়েছে কেবল হতাশা। চলতি মৌসুমে বাজারে পাটের দাম কিছুটা বাড়লেও সেই বাড়তি মূল্য গায়ে লাগেনি তাদের। কারণ, মৌসুমে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন তারা। এখন দাম বাড়লেও অধিকাংশ কৃষকের ঘরে পাট নেই।
গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৯০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকায়। এক মাস আগেও ছিল দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ দেড় মাসে দাম বেড়েছে মণপ্রতি প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা। তবুও লাভের দেখেছেন না কৃষকরা। কারণ, অধিকাংশ কৃষক আগেই ধারদেনা শোধ দিতে কম দামে পাট বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন যারা মজুত রেখেছিলেন তারাই আসল লাভের ভাগ নিচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, হাটবাজারে পাটের দাম নির্ধারণ করে পাটকল মালিক ও ফরিয়া-সিন্ডিকেটরা। মৌসুমের শুরুতে তারা কম দামে পাট কিনে মজুত রাখেন, পরে বাজারে চাহিদা বাড়লে বাড়িয়ে দেন দাম। ফলে কৃষক ন্যায্য দামে বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
গাইবান্ধার ফুলছড়ির চরাঞ্চলের কৃষক মতি মিয়া বলেন, ‘এখন দাম ভালো, কিন্তু আমাদের ঘরে তো পাট নেই। কাটার সময় বিক্রি করেছি ৮০০ টাকায়। তখন না বিক্রি করলে ধার শোধ হতো না। এখন যারা মজুত রেখেছে, তারাই লাভ করছেন।’
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কৃষক সোবাহান মিয়া বলেন, ‘বর্তমানে সার, বীজ, শ্রমিক সবকিছুর দাম বেশি। আবার ঝুঁকি নিতে হয় বন্যা-খরার। এত কষ্ট করে চাষ করে লাভ হয় না। তারপরও চরাঞ্চলে এই সময় পাট ছাড়া কিছুই করা যায় না।’
এদিকে পাইকাররা জানান, পাটের দাম নির্ধারণ করেন না তারা বরং বড় মিল মালিকরাই বাজারে প্রভাব বিস্তার করেন।
ফুলছড়ি হাটের পাইকার শাহ আলম বলেন, ‘আমরা স্থানীয়ভাবে পাট কিনি। কিন্তু দাম ঠিক হয় ঢাকার মিলমালিকদের নির্দেশে। আমরা শুধু তাদের দেওয়া দামে কেনা-বেচা করি।’
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় বিগত ছয় বছর ধরেই কমছে পাটের আবাদ। ২০২১ সালে জেলায় যেখানে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল, ২০২২ সালে তা নেমে আসে ১৪ হাজার ৩১৩ হেক্টরে। পরের বছরও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৭৯০ হেক্টরে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামান্য ৩২ হেক্টর জমিতে আবাদ বাড়লেও এখনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে পাটের বাজার ভালো রযেছে। কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহিত করতে এ বছর জেলায় দুই হাজার কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। তবে, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারলেই কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ ফিরে আসবে।’


