ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চুক্তিটি ইসরায়েলের সামগ্রিক ইরান কৌশলের চেয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর বেশি বড় আঘাত হানতে পারে বলে বিশ্লেষক, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা মনে করছেন।
ইসরায়েলের এই নেতা নিজের কর্মজীবন গড়ে তুলেছিলেন এই দাবিতে যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ইরানের বিষয়ে মার্কিন নীতিকে ইসরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে মেলাতে পারেন, এখন তিনি এমন একটি সমঝোতা দ্বারা একপাশে পড়ে গেছেন যা তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে এমন এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন যিনি একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম। তিনি রিপাবলিকানদের সমর্থন অর্জন করেছিলেন এবং জোর দিয়েছিলেন যে কেবল সামরিক চাপই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
একসময় কূটনীতিকরা তাকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করতেন যিনি ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ইসরায়েলের ইচ্ছা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে পারতেন। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী মার্কিন-ইরান চুক্তি সেই গতিশীলতাকে উল্টে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করার পরিবর্তে নেতানিয়াহু এখন এটি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন যেখানে ইসরায়েলের আপত্তিগুলোকে কেবল বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেনিস রস বলেছেন, নেতানিয়াহু এখন সংঘাত শেষ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভিত্তি–যারা বিশেষ করে লেবাননে কোনো ছাড় দেওয়ার বিরোধী–এই দুইয়ের মাঝে আটকা পড়েছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
পিছু হটলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আর সংঘাত বাড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আবিভ বুশিনস্কি বলেন, এই ইউএস-ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য একটি চূড়ান্ত ধাক্কা। তিনি কেবল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধেই হারেননি, বন্ধু হিসেবে ট্রাম্পকেও হারিয়েছেন।
তিনি এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গেও বড় ধরনের বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে এই মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ককে এমন অংশীদারিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন যেখানে তারা অনেক সময় একমত হন এবং কখনো কখনো দ্বিমত পোষণ করেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে এবং ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধে অবিশ্বাস্য অংশীদার ছিল, যা ইরানি শাসনামলের সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে এবং এতে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর অবস্থানকে যা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে তা হলো তার নিরাপত্তা বেষ্টনী হারিয়ে যাওয়া। বছরের পর বছর ধরে তিনি ডেমোক্রেটিক প্রশাসনের সাথে উত্তেজনা প্রশমিত করতে রিপাবলিকানদের সমর্থনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, রিপাবলিকানরা নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না।
নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি ধরেছিলেন ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করা এবং সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওপর। এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি; ইরানের নেতারা নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছেন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতাও অধরা রয়ে গেছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এটি কেবল ইরানের বিজয় নয়, বরং নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান কেবল টিকেই থাকেনি, বরং আঞ্চলিকভাবে আরও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।


