মরমী কবি ও দার্শনিক ফকির লালন শাহের ১৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘লালন সন্ধ্যা’।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার আয়োজিত ‘লালন সন্ধ্যায়’ শুধু লালনকেই নয়, তার গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনকেও (১৯৫৪-২০২৪) স্মরণ করা হয় গভীর শ্রদ্ধায়।
একুশে পদক (১৯৮৭) ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ (২০১৯) বহু সম্মানে ভূষিত এই শিল্পী লালনগীতিকে তুলে ধরেছিলেন বিশ্বদরবারে। ভারতীয হাই কমিশনের এ আয়োজনে অংশ নেন শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সঙ্গীতপ্রেমী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, ‘লালনের গান শুধু সুর নয়, এটি এক জীবনদর্শন।’ তিনি বলেন, লালনের অন্তর্ভুক্তির বার্তা, মানবতা ও সহনশীলতার দর্শন দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতীক।

প্রয়াত ফরিদা পারভীনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন দুই বাংলার মধ্যে এক সাংস্কৃতিক সেতু, তার কণ্ঠে লালন পেয়েছিলেন নতুন প্রাণ।’ তার সঙ্গীত প্রজন্ম ও জাতিকে একসূত্রে গেঁথেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠান শুধু স্মরণের নয়, বরং দুই দেশের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপনের প্রতীক।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফরিদা পারভীন স্মরণে বিশেষ পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়। যেখানে ছিল তার গানের হিন্দি অনুবাদও। এরপর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করেন তার স্বামী একুশে পদকপ্রাপ্ত বংশীবাদক গাজী আব্দুল হাকিম, তার অনুসারী শিল্পী বিউটি এবং অচিন পাখি কালচারাল একাডেমির শিক্ষার্থীরা।

সাংস্কৃতিক অংশে চন্দনা মজুমদার ও কিরণ চন্দ্র রায়ের একক পরিবেশনাও ছিল অন্যতম আকর্ষণ। লালনের গানকে আধুনিক সময়ে জিইয়ে রাখতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কুষ্টিয়া থেকে আসা টুনটুন বাউল ও তার দলের পরিবেশনাও দর্শকদের বুঁদ করে রাখে।
অনুষ্ঠানে লালনের জীবন, দর্শন ও তার সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রাঞ্জল বক্তব্য রাখেন লালন বিশ্ব সংঘের প্রতিষ্ঠাতা লেখক আব্দেল মান্নান। লালন সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘটে সুমির ব্যান্ড লালনের আধুনিক সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন অভিনেতা আফজাল হোসেন।

কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া লালন শাহ বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। তার দর্শন, ধর্মীয় সহনশীলতা, জাতপাত প্রত্যাখ্যান এবং মানবতার বার্তা সবই ভারতের ভক্তি ও সুফি আন্দোলন এবং বাংলার বাউল ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখনও তার গান গেয়ে দুই দেশের মানুষ নিজেদের ইতিহাস ও শান্তি, সহনশীলতা এবং সাম্যবাদের মূল্যবোধ স্মরণ করে।


