জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদের পাড়ের মানুষ। গত এক মাসের অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুর গ্রামের দুটি পাড়ার প্রায় অর্ধশত বসতভিটা এবং কয়েক একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছে আরও শতাধিক পরিবার। হুমকিতে রয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা, বাজারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের বৃদ্ধা চন্দ্রা বানু এমনই একজন ভুক্তভোগী। নয় সন্তানের এই জননীর সাজানো সংসার সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্র গিলেছে আটবার। জীবনের গোধূলি লগ্নে এসে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্কে দিন পার করছেন তিনি।
আক্ষেপ করে চন্দ্রা বানু জানান, এ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এ পর্যন্ত তিনবার তিন পাড়ায় বসত গড়েছেন। সর্বশেষ ঠিকানার ঘরবাড়িও ভাঙনের মুখে। এভাবেই অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন ঠেকাতে নদের পাড়ে পাইলিং করে বাধ দেয়ার দাবি জানান এই বৃদ্ধা।
নদের নিষ্ঠুর থাবায় মানচিত্র থেকে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে লক্ষ্মীপুর গ্রাম। চোখের সামনে ভিটেমাটি বিলীন হতে দেখে তড়িঘড়ি করে বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন অসহায় মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত কয়েক দিনে ৩০ থেকে ৪০টি ঘর এবং প্রায় ৫০ বিঘা ফসলি জমি নদে হারিয়ে গেছে। গৃহহীন হয়ে অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। ভাঙন রোধে নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না বলে অভিযোগ তাদের।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আমিনুল জানান, আটবার তার জায়গাজমি ব্রহ্মপুত্র নদে কেড়ে নিয়েছে। এখন মাথা গোঁজারও ঠাই নেই। সরকারের কাছে জমি ও বাড়িঘর তৈরি করে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা চান মিয়া জানান, গত কয়েক দিনে তার গ্রামের ৩০ থেকে ৪০টি ঘর ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে গেছে। নদে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি। ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন মানুষজন অন্য জায়গায় চলে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে নদের এই তাণ্ডব। ভাঙন অব্যাহত থাকলে লক্ষ্মীপুর হাজী ফুল মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, মসজিদ ও স্থানীয় বাজার দ্রুতই নদের গর্ভে হারিয়ে যাবে। এর ফলে বিপদে পড়বে এলাকার প্রায় ১৫০টি পরিবার। এসব স্থাপনা রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
লক্ষীপুরের আরেক বাসিন্দা মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এভাবে ভাঙতে থাকলে ১৫০ পরিবার এবং ৪০০ মানুষ উদ্বাস্তু হওয়ার হুমকিতে পড়বে। এছাড়া লক্ষীপুর হাজী ফুল মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয় এবং একটি মাদ্রাসাও ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে না।
রাসেল মিয়া নামে একজন জানান, প্রায় এক মাস আগে ভাঙন শুরুর পর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এতে কোনো কাজ হচ্ছে না। তিনিও নদের তীরে পাইলিং করে স্থায়ী বাধ দেওয়ার দাবি করেন।
এদিকে ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। ইসলামপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জুবায়ের জানান, তিনি সরেজমিনে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বেশ কিছু জায়গায় ইতিমধ্যে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এই কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান জানান, স্থাপনা সংলগ্ন লক্ষ্মীপুর পূর্ব পাড়ায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ মিটার জরুরি কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর পশ্চিমপাড়ায় ভাঙন ঠেকাতে অতি দ্রুত আরও ১০০ মিটার কাজের প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই সেই কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।


