কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাদের অনুপস্থিতি যেন পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না। কোনো বৃষ্টির দিনে, পুরোনো কোনো গানের সুরে, কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো ছোট্ট পারিবারিক ঘটনায় তারা ফিরে আসেন। তারেক মাসুদের দুই সত্তা—জীবনকে উপভোগ করা মানুষ এবং স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা চলচ্চিত্রকার—একসঙ্গে ধরা পড়ে ছোট ভাই নাহিদ মাসুদের স্মৃতিতে।
নাহিদরা তখন গ্রামে, আর তারেক মাসুদ পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক মাস পার হওয়ার পর যখন তিনি গ্রামে যেতেন তখন তা তাদের কাছে ছিল উৎসব। বৃষ্টি এলে তারেক মাসুদ নেমে পড়তেন ভিজতে। খাওয়ার সময় বলতেন, ‘বাইরে বসে খাওয়া যাক। এক কাজ করি, আজকে টেবিলটা বাইরে নিয়ে যাই।’

১৯৮২-৮৩ সালের কথা। তারেক মাসুদ শিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে নির্মাণ করছেন ‘আদম সুরত’। তথ্যচিত্রটির ধান কাটা, গরু গোসল করানো, গরু দিয়ে ধান মাড়ানো—এসব দৃশ্য ধারণ হয়েছিল নাহিদদের গ্রামে। সেই শুটিংয়ে এসেছিলেন মিশুক মুনীর, জাহিদুর রহিম অঞ্জন, এনায়েত করিম বাবুলের মতো তরুণেরা। যারা পরে প্রত্যেকেই হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্রকার।
নাহিদের বয়স তখন বারো কি তেরো। লম্বা চুলের, শিল্পী-স্বভাবের সেই তরুণদের দেখাটাই ছিল অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ক্যামেরা হাতে তাদের পেছনে পেছনে ছুটতেন কিশোর নাহিদ—‘আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি তখন তাদের চরিত্রগুলোর প্রেমে পড়েছিলাম। যে এরকম স্বাধীন মানুষও হয়। যারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করে।’
তারেক মাসুদ তখন বিশ্বাস করতেন মার্কসবাদে। বাড়িতে এলে প্রতিবেশী আলমগীরের সঙ্গে হতো তুমুল তর্ক। আলমগীর মনে করতেন, সমতার সেই স্বপ্ন বাস্তবে সম্ভব নয়। তারেক মাসুদ বলতেন, ‘মানুষের সমান অধিকার কেন সম্ভব হবে না?’
সময়ের সঙ্গে সেই বিশ্বাসেও এসেছিল পরিবর্তন। বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল। নাহিদ মাসুদের ভাষায়, ‘বৈষম্যহীন এক পৃথিবীর স্বপ্নটা তারেক ভাই কখনো ছাড়েননি। শুধু সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর পথটা নিয়ে তার ভাবনা বদলেছিল বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে।’

১৯৯০ সালে মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়া লেভিনের কাছ থেকে তারেক মাসুদ খুঁজে পান ১৯৭১ সালে ধারণ করা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপুল ফুটেজ। শর্ত ছিল—সেই ফুটেজ আমেরিকার বাইরে নেওয়া যাবে না। বাধ্য হয়ে নিউইয়র্কে বসেই সারতে হয় সম্পাদনার কাজ। পুরোনো একটা স্টিনব্যাক এডিটিং মেশিন কিনে, নিজে চালাতে শিখে, সেই মেশিনেই তৈরি হয় ‘মুক্তির গান’। এই কাজ করতে গিয়ে তারেক মাসুদের ক্রেডিট কার্ডে জমে যায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলারের ঋণ।
১৯৯৫ সালের শেষদিকে ছবিটি নিয়ে দেশে ফেরেন তারেক মাসুদ। ইচ্ছা ছিল, সিনেমা হলে মুক্তি পাবে ছবিটি। ১৬ মি.মি. থেকে ৩৫ মি.মি.-তে রুপান্তরের পর ৪-৫টি প্রিন্টও করেছিলেন। ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ তিনি বেছে নেন বিকল্প প্রদর্শনীর পথ। পাবলিক লাইব্রেরিতে মাত্র বিশ টাকা টিকেটের প্রদর্শনীর দিনগুলোয় লম্বা লাইন পড়ত দর্শকের।
নাহিদ মাসুদ তখন কাজ করতেন প্রজেকশনিস্ট হিসেবে। একটি পোর্টেবল ভিডিও প্রজেক্টর আর ভাঁজ করা যায় এমন স্ক্রিন নিয়ে ঘুরতেন জেলা শহরে শহরে। প্রতিটি প্রদর্শনী শেষে দর্শকের কাছে তারেক মাসুদ বলতেন, ‘আমি কোনো ছবির প্রশংসা চাই না। আমি আপনাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথা শুনতে চাই।’
সেখান থেকে জন্ম নেয় ‘মুক্তির কথা’। একদিন পাবলিক লাইব্রেরিতে এক নারী রেখে যান চিঠি। ছবিতে দেখা এক দৃশ্যে তিনি চিনে ফেলেছিলেন নিজের হারানো ভাইকে—শরণার্থী শিবিরে গান শোনা এক জনতার ভিড়ে। আবার আমেরিকার এক রেস্তোরাঁয় দেখা মেলে আরেক প্রত্যক্ষদর্শীর, যার হাতের আংটিটাই ছিল ছবির ভেতরের এক দৃশ্যের সাক্ষী। এমন অসংখ্য গল্প জমা হয়েছিল বছরের পর বছর।
সবশেষ ছবি ‘কাগজের ফুল’-এর জন্য এমন পানির স্তর দরকার ছিল যা পেতে অপেক্ষা করেছিলেন চার বছর। মানিকগঞ্জের এক জমিদারবাড়ির সামনের নদীতে সে বছর বন্যায় এমন পানির স্তর পাওয়ার পর শেষ করলেন শুটিং প্রস্তুতি। ঠিক তখনই মারা যান তাদের বাবা—তারেক মাসুদের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে।

নাহিদ মাসুদ ও স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে ডেকে তারেক মাসুদ বলেছিলেন, ‘আমি জানি এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা এবার শুটিংটা পিছিয়ে দিই।’
মায়ের পাশে থাকার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু চার দিন পর মনে হলো মা কিছুটা স্থির হয়েছেন। শুটিংয়ের এই সুযোগ হয়তো আর মিলবে না—এই ভাবনা থেকে আবার সবাইকে নিয়ে মানিকগঞ্জের পথে রওনা দেন।
‘কাগজের ফুল’ দেশভাগের প্রেক্ষাপটে এক পিরিয়ড ছবি। ‘মাটির ময়না’র কাজী চরিত্রের যৌবনের গল্প। তারেক মাসুদের নিজের বাবার জীবনের কিছু অভিজ্ঞতাও মিশে ছিল সেই চিত্রনাট্যে। যদিও নাহিদের ভাষায়, ‘তা ছিল তারেক মাসুদের একান্ত নিজস্ব ব্যাখ্যায় গড়া।’
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট। দুর্ঘটনার মাত্র কুড়ি-পঁচিশ মিনিট আগে তারেক মাসুদ ফোন করেছিলেন নাহিদকে। কথা হয়েছিল—কীভাবে মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের মানসিক অসুস্থ বোনকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া যায়, তাকে কে দেখভাল করবে সেই সময়টায়।
নাহিদের ভাষায়, ‘বড় বড় বিষয় সামলানোর মধ্যেও ছোট ছোট খুঁটিনাটি মনে রাখার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তারেক ভাইয়ের। বড় শুটিং ইউনিট সামলানোর ফাঁকেও তিনি মনে রাখতেন ঘরের বাজার, কী রান্না হবে, টেবিল সাজানোর কথা।’
সেই ফোনকলের পর আসে দুর্ঘটনার খবর। পাঁচ দিন আগে বাবাকে হারানো নাহিদের প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি সেই খবর।
‘কাগজের ফুল’ আজও অসমাপ্ত। ক্যাথরিন মাসুদসহ সবার ইচ্ছে ছবিটি শেষ করার। তিনি বললেন, ‘আমরা চাই ছবিটা হোক। কিন্তু তারেক ভাই যেভাবে চেয়েছিলেন, ঠিক সেই মানেই যেন এটি তৈরি হয়।’


