নেপালি ছাত্র বিপিন জোশি কৃষি নিয়ে পড়াশোনার জন্য হিসেবে গাজার নিকটবর্তী ইসরায়েলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থান করছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস সেখানে হামলা করে প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা করে। সে সময় তারা অপহরণ করে আড়াইশ’ জনকে, এদেরই একজন বিপিন।
এরপর প্রায় দুই বছর হতে চলল। বিপিন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, তার পরিবার তা জানে না। পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন তার কথা ভাবেন। আশা করেন, বিপিন হয়তো এখনো বেঁচে আছে। তার মা ও বোন এটাও ভাবেন যে, অপহরণকারীরা তাকে ঠিকমতো খেতে দেয় কি না বা তার গায়ে জামা কাপড় রয়েছে কি না।
বিপিন বেঁচে আছেন, এমন আশায় তার সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে বাধ সাধে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা। আন্দোলনে নেপাল সরকারের পতন ঘটলে তাকে মুক্ত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। হতাশ হয়ে পড়েন বিপিনের পরিবার।
‘প্রতিদিন আমি ওর কথা ভাবি, দোয়া করি যেন আমার ছেলে জীবিত থাকে,’ গত বুধবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন তার বিপিনের মা পদ্মা জোশি।
‘আমার ছেলে কোনো পক্ষে ছিল না। সে বিদেশি ছাত্র হিসেবে সেখানে পড়তে যায়। আমাদের বিনীত অনুরোধ, হামাস যেন আমার ছেলেকে মুক্ত করে,’ এভাবেই আকুতি জানান বিপিনের মা।
নেপালের হিমালয়ে একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বিপিনের বাড়ি, যা ইসরায়েল ও গাজা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে।

২০২৩ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিপিন নেপাল ছেড়ে পড়াশোনা ও কাজের জন্য ইসরায়েলের আরেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যান। গাজা সীমান্তের কাছে কিবুত্জ আলুমিম নামের এলাকায় তিনি থাকতেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, সেখানে তিন মাত্র সপ্তাহ কাটানোর পর হামাসের বন্দুকধারীরা হামলা চালায়। বিপিন এক দুগ্ধশালায় আশ্রয় নেন। হামাস সেখানে হামলা চালালে ডজনখানেক মানুষ নিহত হন। অনেকের সঙ্গে তারা বিপিনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়।
আক্রমণের পর গাজায় বিপিনের মতো দেখতে একজনকে দেখানো একটি ভিডিও ছাড়া তার পরিবার তার সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পায়নি। কয়েক মাস পূর্বে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে হামাস গাজায় আটক ৪৮ জন জিম্মির একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে বিপিনও ছিলেন।
তবে গত সপ্তাহে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জীবিত ২০ জিম্মির নাম উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে বিপিনের নাম ছিল না।
ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রায় ২৫ জন অপহৃতের মরদেহ হামাসের কাছে আছে। এমন খবর বিপিনের পরিবারের জন্য হতাশার। কিন্তু তার প্রিয়জনরা তাকে ভুলে যাননি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে জোশি পরিবার বার বার নেপাল, নিউইয়র্ক ও ইসরাইল ভ্রমণ করে। নেপালে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা সরকারকে আরব দেশগুলোর, বিশেষত কাতারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিপিনকে উদ্ধারের জন্য হামাস নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চালানোর অনুরোধ জানায়।
আগস্টে বিপিনের মা ও বোন ইসরায়েল ভ্রমণ করেন। সেখানে তারা প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং অন্য জিম্মি পরিবারের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন।
গত সপ্তাহে তারা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ চলাকালে ইসরায়েলের প্রতিনিধিদলের অংশ হয়ে নিউইয়র্ক যান এই উদ্দেশে, যেন বিপিন জোশীর বিষয়টা বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অপহরণের পর থেকে তার পরিবার গাজার ইসরায়েলের হামলা ও সংঘাতের ঘটনায় নজর রাখছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সফল হয় কিনা, তা তারা উৎকণ্ঠার সঙ্গে দেখছেন। এর পূর্বে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা বিপিনির পরিবারে আশার সঞ্চার করলেও শেষ পর্যন্ত তারা হতাশ হয়েছেন। এবার আবার তারা আশান্বিত।
তবে গাজাতে সিটিতে ইসরায়েল স্থল অভিযান জোরদার করায় অনেক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। কেননা, ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই মনে করেন গাজায় নেতানিয়াহুর সামরিক অভিযান জিম্মিদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
হামাসের আক্রমণ ও অপহরণ পর গত দুই বছরে ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলায় ৬৫ হাজারের বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু।
‘আমরা বিশ্বাস করি, সে খুব শিগগির ফিরে আসবে,’ বলেন বিপিনের বোন পুষ্পা জোশি।
‘আমরা আমাদের স্বপ্নগুলো পূর্ণ করব, আমরা আবার ভ্রমণ করব, অনেক গল্প করব এবং একসাথে গান গাইব,’ ভাইকে নিয়ে এভাবেই আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভাইকে ফিরে পেতে পুষ্পার চেষ্টার অন্ত নেই। তিনি এখন নিজে নিজে ইংরেজি শিখছেন যেন ভাইয়ের মুক্তির জন্য প্রচারণা চালাতে পারেন।


