১৯৬৫ সাল। এক অচেনা যুবক হঠাৎ এসে দাঁড়ালেন এক কিশোরীর সামনে, বললেন—একটি ছবির নায়িকা হবেন তিনি। ছবির নাম বেহুলা, যুবকের নাম জহির রায়হান। প্রায় ছয় দশক পর সেই কিশোরী—আজকের সুচন্দা—ফিরে তাকান সেই দিনগুলোর দিকে, স্মৃতি থেকে উঠে আসে প্রেম, বিয়ে, সংসার আর এক কাজপাগল মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।
যশোর ও বরিশাল ঘুরে তখন সুচন্দা ঢাকার সিটি নাইট কলেজের ছাত্রী, রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, চলচ্চিত্রে আসার স্বপ্ন ছিল না। সুভাষ দত্তের ছবিতে অভিনয় শুরুর পর জাগে আগ্রহ, আর সেখান থেকেই কানে আসে নাম—জহির রায়হান। একদিন হঠাৎ তিনি হাজির হন গেণ্ডারিয়া-ফরিদাবাদের বাসায়। বড় পরিচালক শুনে বয়স্ক ভেবেছিলেন সুচন্দা, কিন্তু সামনে দেখে চমকে যান—তরুণ চেহারায় মনে হচ্ছিল যেন এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি।
শুকনো, পাতলা, ছিপছিপে তরুণ জহির রায়হান অল্প কথায় জানালেন, ‘বেহুলা’ ছবিতে নায়িকা করতে চান সুচন্দাকে। তখন ‘কাগজের নৌকা’র শুটিংয়ে ব্যস্ত সুচন্দা, ছবির ব্যাপারে সরাসরি কথা বলার নিয়মও ছিল না তার—বাবাই দেখতেন সব। সেই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎই হয়ে ওঠে দুজনের গল্পের প্রথম পাতা।
‘বেহুলা’র শুটিংয়ে জহির রায়হান নিজেই ক্যামেরার পেছনে থেকে বেশিরভাগ শট নিতেন, পাশ থেকে দিতেন নির্দেশনা। সেই তাকানোর ভেতর থেকেই সুচন্দা টের পান তাঁর প্রতি দুর্বলতা—“উনার চোখ দেখে বুঝেছিলাম, উনি ভীষণ দুর্বল আমার প্রতি।” কলেজপড়ুয়া মেয়ের দ্বিধা-কৌতূহল নিয়েই সেই চাহনির উত্তর খুঁজেছিলেন সুচন্দাও। ভালোবাসার কথা প্রথম বলেছিলেন জহির রায়হানই। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায় ‘বেহুলা’, তবে বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে আরও দুই বছর।
ক্যারিয়ার তখন সবে দাঁড়াতে শুরু করেছে সুচন্দার। রক্ষণশীল পরিবারের বড় সন্তান তিনি, অসুস্থ বাবা আর ছোট ভাইবোনদের দায়িত্ব কাঁধে। জহির রায়হান তখন ইতোমধ্যে বিবাহিত—প্রথম স্ত্রী সুমিতা দেবী। এসব মিলিয়ে বারবার সংসার শুরু করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন সুচন্দা। কিন্তু জহির রায়হান নাছোড়।
একদিন হঠাৎ গাড়ি নিয়ে বাসায় হাজির হন তিনি, বলেন শুটিং আছে, চলো। বাবা-মা কিছু সন্দেহ করেননি। কিন্তু গাড়ি এফডিসির দিকে না গিয়ে ছোটে ধানমন্ডির দিকে। “আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল, তাই বাধ্য হয়ে আমাকে বিয়ে করতেই হলো,” বলেন সুচন্দা।
ধানমন্ডিতে এক বন্ধুর বাসায়, ঘরোয়া পরিবেশে, ১৯৬৮ সালের শেষদিকে বিয়ে হয় তাদের—উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা বেবি জামানসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন। অনেকদিন নিজের পরিবারকে জানাতে পারেননি সুচন্দা, শেষে মায়ের মাধ্যমে জানান বাবাকে। একদিন জহির রায়হান বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “বরদা, আমি বিয়ে করেছি”—সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে জানে জহিরের পরিবার, যদিও সুচন্দার ধারণা তারা আগেই জানতো।
সুচন্দার ভাষায় জহির রায়হান ছিলেন এক “কাজপাগল মানুষ”। যৌথ পরিবারে থেকেও সন্তান, স্ত্রী বা ঘোরাঘুরি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল না। “বাচ্চাকে নিয়ে খেলাধুলা, বেড়াতে নেওয়া, স্ত্রীকে খেতে নিয়ে যাওয়া—এসব কখনো করতেন না,” বলেন সুচন্দা। তবু অভিমান জমতে দেননি, কারণ ভালোবাসার শুরুটাই হয়েছিল অন্যভাবে—“প্রথমে তার কাজকে ভালোবেসেছি, পরে সেই মানুষটিকে। তার স্ত্রী হওয়াটাই সৌভাগ্য বলে মেনে নিয়েছিলাম, বাকি সবকিছু মাইনাস।”
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, সকাল দশটা দশ। নাশতার টেবিলে বসারও সময় হয়নি জহির রায়হানের—বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের খোঁজে বেরোনোর তাড়া। নিচে অপেক্ষায় এক আর্মি অফিসার। চাবি হাতে সিঁড়ি নেমেও ফিরে আসেন একবার, টাকা চান। আলমারি খুলে যা ছিল বান্ডিলটাই দিয়ে দেন সুচন্দা, গোনার সময়ও ছিল না। সেটাই ছিল শেষ কথা, শেষ দেখা। মিরপুরসহ বহু লাশের সারিতে খুঁজেছেন তাকে, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়েছেন খোঁজে—উত্তর মেলেনি। জহির রায়হান আর ফেরেননি।
‘বেহুলা’ দিয়ে বাংলা ছবির প্রতি দর্শক টেনে আনা, ‘জীবন থেকে নেয়া’য় গানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদকে শিল্পে রূপ দেওয়া, আর অসমাপ্ত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এ যুদ্ধ-মানবতার সংকট নিয়ে ভাবা মানুষটির স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ বলে মনে করেন সুচন্দা।


