কেউ সিনেমায় রেখে যান কিছু স্মরণীয় চরিত্র, কেউ রেখে যান কিছু বিখ্যাত সংলাপ। আর প্রবীর মিত্র রেখে গেছেন এমন সব মানুষ, যাদের দর্শক মনে করেছেন নিজের খুব আপন কেউ।
কখনো জেলে, কখনো সাধারণ মানুষ, কখনো ইতিহাসের চরিত্র, আবার কখনো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এক বাবা। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে চার শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ।
১৯৪১ সালের ১৮ আগস্ট চাঁদপুরে জন্ম প্রবীর মিত্রের। বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। স্কুলজীবনেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে মঞ্চে হাতেখড়ি। এরপর ১৯৬৯ সালে নির্মিত ও ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এইচ আকবরের ‘জলছবি’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। ছবিটিতে তার সঙ্গে অভিনয় করেন ফারুকও, যারও ছিল এটি চলচ্চিত্রে অভিষেক।
‘চাবুক’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-তে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের পর ধীরে ধীরে নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন প্রবীর মিত্র।
কিশোর—তিতাস একটি নদীর নাম
ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ কিশোর চরিত্রে প্রবীর মিত্রের অভিনয় আজও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত। সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়া এক জেলের জীবনের অসহায়ত্ব তার অভিনয়ে হয়ে উঠেছিল নদীপাড়ের মানুষের দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চিত জীবনের প্রতিচ্ছবি।
লোকমান—বড় ভালো লোক ছিল
আবদুর রাজ্জাকের ইয়াসিনের বিপরীতে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ ছবিতে লোকমান চরিত্রে দেখা যায় প্রবীর মিত্রকে। প্রেম, প্রতিশোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধের টানাপোড়েনে থাকা এক সাধারণ মানুষের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পায়। এই ছবির জন্য ১৯৮২ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা—রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা
ঐতিহাসিক চরিত্রেও নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন প্রবীর মিত্র। ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ধারণ করেছিলেন ইতিহাসের ভার। এটি ছিল তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নায়ক চরিত্র। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তিনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মন্টু ও রহমত আলী
‘নয়নের আলো’ ছবির মন্টু চরিত্রে প্রবীর মিত্রের অভিনয়ে ফুটে ওঠে বয়সের সঙ্গে তার অভিনয়ের পরিবর্তন। তরুণদের গল্পের ভেতরেও তাঁর চরিত্রটি হয়ে ওঠে স্থিরতা, অভিজ্ঞতা ও আবেগের গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা।
আর ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’ ছবিতে রহমত আলী চরিত্রে তিনি ছিলেন শাকিব খানের চরিত্রের বাবা ও একজন পুলিশ কনস্টেবল। জীবনের শেষ দিকের অভিনয়ে এমন দায়িত্বশীল, কর্মজীবী বাবার চরিত্রেই যেন বারবার ফিরে এসেছেন তিনি।
চার শতাধিক সিনেমার পথচলা
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রবীর মিত্র অভিনয় করেছেন অসংখ্য সিনেমায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘সীমার’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’, ‘জয় পরাজয়’, ‘অঙ্গার’, ‘পুত্রবধূ’, ‘চাষীর মেয়ে’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘আবদার’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘জালিয়াত’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘ফরিয়াদ’, ‘রক্ত শপথ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘তরুলতা’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘মধুমিতা’, ‘অশান্ত ঢেউ’, ‘অলংকার’, ‘অনুরাগ’ ও ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’।
অভিনয়ের স্বীকৃতিও এসেছে বারবার। ‘শিমার’ ছবির জন্য ১৯৮৪ সালে এবং ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’-এর জন্য ১৯৮৮ সালে বাচসাস পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি। ২০১৫ সালে পান এজেএফবি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। ২০১৮ সালে অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা।
২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান প্রবীর মিত্র। অক্সিজেনের ঘাটতি, বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও দীর্ঘদিনের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।
তবে অভিনয়শিল্পীর মৃত্যু হয় না। তাই প্রবীর মিত্র ফিরে আসেন তার চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে—কিশোর, লোকমান, সিরাজউদ্দৌলা, মন্টু কিংবা রহমত আলী হয়ে।


