অনলাইনে প্রাণঘাতী রাসায়নিক বিক্রি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে আত্মহত্যায় সহায়তা করার অভিযোগ স্বীকার করেছেন কানাডার এক ব্যক্তি। ৬০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির নাম কেনেথ ল। তিনি আত্মহত্যায় সহায়তা বা প্ররোচনা দেওয়ার ১৪টি অভিযোগ স্বীকার করেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, শুক্রবার কানাডার অন্টারিও প্রদেশের নিউমার্কেট আদালতে তিনি এই স্বীকারোক্তি দেন। কৌঁসুলিদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। বিনিময়ে তার বিরুদ্ধে থাকা আরও গুরুতর হত্যার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তার সাজা নির্ধারণের শুনানি শুরু হবে।
তথ্য অনুযায়ী, সাবেক শেফ ও প্রকৌশলী কেনেথ ল একাধিক ওয়েবসাইট পরিচালনা করতেন, যেখানে আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের কাছে প্রাণঘাতী রাসায়নিক, আত্মহত্যার সরঞ্জাম এবং সেগুলো ব্যবহারের বিস্তারিত নির্দেশনা বিক্রি করা হতো। তিনি ৪০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০টি বিষাক্ত পদার্থের প্যাকেট পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চালান গিয়েছিল যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তার ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার আগে ৪১টি দেশে মোট ১ হাজার ২০৯টি প্যাকেজ পাঠানো হয়েছিল। এসব প্যাকেটের বেশির ভাগই আত্মহত্যাবিষয়ক অনলাইন ফোরামের ব্যবহারকারীদের কাছে পাঠানো হয়।
আদালতে কেনেথ ল স্বীকার করেছেন, অন্টারিওতে ১৬ থেকে ৩৬ বছর বয়সী ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে ৭৯ জনের মৃত্যুর জন্য ব্যবহৃত প্রাণঘাতী পদার্থ সরবরাহ করার কথাও স্বীকার করেন। তবে এসব মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পৃথক কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
যুক্তরাজ্যের তদন্তে দেখা গেছে, দেশটিতে অন্তত ২৮৬ জন কেনেথ লের কাছ থেকে প্যাকেজ পেয়েছিলেন, যার সঙ্গে ১১২টি মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্য কেনেথ ল–এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় দেশটির ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো ক্ষোভ জানিয়েছে। কৌঁসুলিরা কেন কেনেথ ল–এর বিরুদ্ধে মামলা করলেন না, সে প্রশ্ন তুলেছে তারা।
কেনেথ লকে ২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে তদন্তে কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি-সহ প্রায় এক ডজন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থা অংশ নেয়।
গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, কেনেথ ল তরুণদের কাছে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি করছিলেন। প্রতিবেদনের জন্য এক সাংবাদিক ক্রেতা সেজে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কীভাবে বিষ ব্যবহার করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি থাকে, সে সম্পর্কেও পরামর্শ দেন বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, ধরা পড়া এড়াতে কেনেথ ল তার ওয়েবসাইটে অন্যান্য পণ্যও বিক্রি করতেন। এর মধ্যে ঝাল সসসহ কিছু খাদ্যপণ্য ছিল, যাতে ব্যবসাটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বলে মনে হয়।
আদালতে উপস্থাপিত নথিতে বেশ কয়েকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে। অনেক ভুক্তভোগী বিষ গ্রহণের পর জরুরি সেবায় ফোন করে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চাইলেও চিকিৎসকেরা তাদের বাঁচাতে পারেননি।
কানাডার অন্টারিওর বাসিন্দা ১৯ বছর বয়সী অ্যাশটিন প্রোসার ব্লেক ছিলেন কেনেথ লের ভুক্তভোগীদের একজন। ২০২৩ সালের মার্চে তিনি আত্মহত্যা করেন। তার মা কিম প্রোসার বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর ছেলের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি ও কোমল স্বভাবের একজন তরুণ।
আদালতের বাইরে কিম প্রোসার বলেন, “কাউকে কারাগারে পাঠালেই যে আমার ছেলেকে হারানোর কষ্ট কমে যাবে, তা নয়।”
গ্রেপ্তারের সময় কেনেথ লের ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার কানাডিয়ান ডলার জমা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
কানাডার ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, আত্মহত্যায় সহায়তা বা প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে মামলার ব্যাপকতা, ভুক্তভোগীর সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে কেনেথ ল কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।


