২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা আফ্রিকানরা একটি মুহূর্ত চিরকাল মনে রাখবেন। সেটি ছিল দোহার আল থুমামা স্টেডিয়ামের ১০ ডিসেম্বরের এক ম্যাচ। পুরো স্টেডিয়াম তখন এমনভাবে কাঁপছিল যেন গোটা আফ্রিকা মহাদেশ সেখানে এসে জড়ো হয়েছে। পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিওগো কস্তাকে ফাঁকি দিয়ে ইউসেফ এন-নেসিরি লাফিয়ে উঠে বল জালে জড়ালেন। মরক্কো ১, পর্তুগাল ০। বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে পা রাখল মরক্কোর ‘অ্যাটলাস লায়নস’। তখন চোখে জল নিয়ে মাঠ ছাড়ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আর আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা পেয়ে গেলেন নতুন এক স্বপ্ন ছোঁয়ার ঠিকানা।
চার বছর পর সেই মুহূর্তের প্রেরণা বুকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর মাটিতে পা রাখছে আফ্রিকার দশটি দেশ। বিশ্বকাপে আফ্রিকার এত বড় এবং সুপ্রস্তুত দল এর আগে কখনো আসেনি। আফ্রিকা থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলাটা এখন আর অলীক কোনো স্বপ্ন নয়। গত তিন দশকের ফুটবল ইতিহাস বলছে, এই আলোচনা এখন কেবল যৌক্তিকই নয়, বরং খুবই প্রাসঙ্গিক।
জায়ারের বিশৃঙ্খলা থেকে মরক্কোর গৌরব
বিশ্বকাপে আফ্রিকার গল্প শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। প্রথম সাহারা-নিম্ন আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় জায়ার (বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো)। পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ বিশৃঙ্খল। যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলে হার, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে বিতর্ক এবং সেই ঐতিহাসিক ঘটনা—যখন ডিফেন্ডার মুয়েপু ইলুঙ্গা ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই রক্ষণভাগের দেয়াল থেকে ছুটে এসে ব্রাজিলের বলটিতে লাথি মেরে বসেন।
তবে এই মহাদেশের ফুটবলের পরিপক্বতা এসেছে ধীরে ধীরে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে গ্রুপ পর্ব পার হয়। এরপর ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের যাত্রা ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রূপকথা। ৩৮ বছর বয়সী রজার মিলা রাষ্ট্রপতির বিশেষ অনুরোধে অবসর ভেঙে দলে ফেরেন। প্রতিটি গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে তার সেই নাচ এবং উদ্বোধনী ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেওয়া ফুটবলপ্রেমীরা কোনোদিন ভুলবে না। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে অতিরিক্ত সময়ের হারে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। তবে আফ্রিকা ততদিনে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আগমনী বার্তা দিয়ে দেয়।
এরপর ২০০২ সালে আসে সেনেগালের রূপকথা। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই উদ্বোধনী ম্যাচে তারা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। ওরাও কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। ২০১০ সালে ঘানা সেই সাফল্য স্পর্শ করে এবং পারফরম্যান্সের দিক থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। উরুগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচে লুইস সুয়ারেজ গোললাইন থেকে হাত দিয়ে বল আটকে লাল কার্ড পান। কিন্তু আসামোয়া গায়ানের নেওয়া পেনাল্টি শটটি বারে লেগে ফিরে আসে। টাইব্রেকারে হেরে যায় ঘানা। ক্রসবারে লেগে বলটি ফিরে না এলে ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে ঘানা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে যেত।

ঘানার সেই অপূর্ণ স্বপ্ন সত্যি করে মরক্কো। কাতারে তারা বেলজিয়াম, স্পেন এবং পর্তুগালকে বিদায় করে শেষ চারে পৌঁছায়। সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সের কাছে হেরে যায়। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই বলেছিলেন, “আগে শুধু মরক্কোর মানুষ আমাদের সমর্থন করত, এখন পুরো আফ্রিকা আর আরব বিশ্ব আমাদের পাশে আছে।” দীর্ঘ চল্লিশ বছরের ধারাবাহিক উন্নতির ফলেই মরক্কো সেই ঐতিহাসিক রাতে পৌঁছাতে পেরেছিল।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট
এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকার জন্য সরাসরি খেলার সুযোগ পাঁচটি থেকে বাড়িয়ে রেকর্ড নয়টি করা হয়েছে। ফলে ৪৮ দলের এই টুর্নামেন্টে আফ্রিকার অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। দলগুলোর মানও এখন পুরো মহাদেশ জুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সেনেগাল এবার তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গোছানো দল নিয়ে এসেছে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৪ নম্বরে থাকা এই দলটির মূল কাণ্ডারি সাদিও মানে। তার সাথে আছেন কালিদু কুলিবালি, পাপে গুয়ে এবং এদুয়ার্দ মেন্দির মতো তারকারা। কোচ পাপে বুনা থিয়াও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “সেনেগালকে নিয়ে বিশ্বকাপ জেতার বিশ্বাস যদি আমি এক সেকেন্ডের জন্যও হারাই, তবে আমি কোচের পদ থেকে ইস্তফা দেব।”
তাদের মনে একটি ক্ষোভও কাজ করছে। গত জানুয়ারির আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ফাইনালে মাঠ বর্জন করার পর কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল তাদের শিরোপা কেড়ে নিয়ে মরক্কোকে দিয়ে দেয়। সেবার ফাইনাল ম্যাচে কোচের নির্দেশে সেনেগালের ফুটবলাররা কিছু সময়ের জন্য মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় এই শাস্তি দেয় আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন। সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার আগুনকে এবার শক্তিতে রূপান্তর করেছে সেনেগাল। আগামী ১৬ জুন নিউইয়র্কে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তারা বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে।
এবারের আসরে বড় চমক হতে পারে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো। তারা বাছাইপর্বে ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়াকে বিদায় করে এবং আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে জ্যামাইকাকে হারিয়ে মূল পর্বে এসেছে। এছাড়া ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে আইভরি কোস্ট। আমাদ দিয়ালো, সিমন আদিংগ্রা এবং তরুণ ইয়ান দিওমান্দেকে নিয়ে তাদের আক্রমণভাগ বেশ গতিশীল। চোটের কারণে মোহাম্মদ কুদুসকে না পেলেও ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড অ্যান্টোইন সেমেনিয়োকে নিয়ে মাঠে নামছে ঘানা। ইংল্যান্ড, পানামা এবং ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হলেও তারা পরের পর্বে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।

কাঠামোগত পরিবর্তন
আফ্রিকার ফুটবলে এখন শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার পরিবর্তন হয়নি, বরং প্রবাসী খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ানোর প্রক্রিয়াটি বড় ভূমিকা রাখছে। ইউরোপে জন্ম নেওয়া আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা এখন নিজেদের বেড়ে ওঠার দেশের চেয়ে বাবা-মায়ের দেশের হয়ে খেলাকেই বেশি বেছে নিচ্ছেন। ২০২২ সালের মরক্কো দল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সেনেগাল, কঙ্গো এবং আইভরি কোস্টও এখন একই মডেলে দল সাজাচ্ছে। ফলে আফ্রিকার ফুটবলারদের প্রতিভা খোঁজার ক্ষেত্রটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
৪৮ দলের এই নতুন ফরম্যাটও দলগুলোকে কাঠামোগত সুবিধা দিচ্ছে। এখানে গ্রুপ পর্বের তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা ১৬টি দলও পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে এক ম্যাচ খারাপ হলেও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার ভয় থাকবে না। নকআউট পর্বে যাওয়ার জন্য লড়তে থাকা দলগুলোর জন্য এটি বড় একটি সুযোগ।
আসল মূল্যায়ন
এই সব ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতার ব্যবধানকে অস্বীকার করা যায় না। এখন পর্যন্ত কোনো আফ্রিকান দল বিশ্বকাপ জেতেনি, এমনকি ফাইনালেও পৌঁছাতে পারেনি। ক্যামেরুন, সেনেগাল এবং ঘানার আটকে যাওয়া কোয়ার্টার ফাইনালের দেয়ালটি ভাঙা সবসময়ই কঠিন ছিল। মরক্কো কেবল একবার সেই দেয়াল ভাঙতে পেরেছে। ২০২৬ সালের মূল প্রশ্ন হলো, এবার কি কোনো দল তার চেয়েও দূরে যেতে পারবে?
খাতাকলমে সেনেগালই সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার। কঙ্গো হতে পারে এই আসরের সবচেয়ে বড় চমক, আর আইভরি কোস্ট দেখাতে পারে যেকোনো ওলটপালট। এই তিনটি দলেরই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মতো গভীরতা এবং ভালো কোচ রয়েছে। তবে তারা দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের সেরা দলগুলোকে হারিয়ে আরও দুই, তিন বা চার ধাপ এগিয়ে যেতে পারবে কি না—সেটিই এখন আফ্রিকান ফুটবলের উত্তর না জানা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


