বাংলাদেশের প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার হলেও জীবনসঙ্গী বা স্বামীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতা। পাশাপাশি সঙ্গী বা স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণেরও শিকার হয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) চালানো এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার প্রকাশিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে দেশের নারী ও মেয়েদের ওপর সহিংসতার মাত্রা প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া ৪৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন গত এক বছরে তারা এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন ভুক্তভোগী (৬২ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা যে সহিংসতার মুখোমুখি হন তা কখনোই প্রকাশ করেননি।
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৪ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ সবশেষ এক বছরে একাধিকবার সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন।
এমনকি বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ গর্ভাবস্থায়ও শারীরিক সহিংসতার শিকার জন, ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হন যৌন সহিংসতার মুখোমুখি। যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত নির্দিষ্ট কিছু জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইল, ছবির অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
প্রতি দুইজনের মধ্যে একজনেরও কম নারী জানেন যে কোথায় সহিংসতার অভিযোগ জানাতে হয়। মাত্র ১২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী সহিংসতার সহায়তাকারী হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে জানেন।
জরিপে জাতিসংঘের সংজ্ঞায়িত সহিংস আচরণগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সহিংসতামূলক আচরণও পরিমাপ করা হয়েছে।
জরিপে উঠে এসেঠে নন-পার্টনার ব্যক্তির দ্বারা সহিংসতার বিষয়টিও। সে অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ নারী ১৫ বছর বয়স থেকে নন-পার্টনার ব্যক্তির কাছ থেকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হন। এছাড়া ২ দশমিক ২ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
এখানে ‘জীবনসঙ্গী’ বলতে বর্তমান বা সাবেক স্বামী এবং ‘নন-পার্টনার’ বলতে বর্তমান বা প্রাক্তন স্বামী ছাড়া অন্য যেকোনো ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।
জরিপের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনাও তুলে ধরা হয়। যেখানে সহিংসতা প্রতিরোধে জরুরি বিনিয়োগ, পরিষেবা শক্তিশালী করা এবং বিচার প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেন্ডার সমতা এবং মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি সহায়ক আইনি ও নীতিগত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনের সবচেয়ে বৃহৎ পরিসরের জরিপ এটি। প্রতিবেদনটি সহিংসতার ব্যাপকতা ও প্রভাব সম্পর্কে দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে। যা নীতি প্রণয়নে জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
জরিপে দেখা গেছে, সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য নারীদের এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার সামাজিক নানা রীতিনীতি অনেক নারীকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।
জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম, বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত মিসেস শবনম মুস্তারি।


