ফুটবলের আবেদন বিশ্বজনীন হলেও এর ভাষা স্থানীয়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে উত্তর আমেরিকায় জড়ো হওয়া নানা দেশের সমর্থকরা শুধু পতাকা, জার্সি বা স্লোগান আনছেন না, সঙ্গে আনছেন এক সমৃদ্ধ ফুটবলীয় শব্দভাণ্ডার। এই শব্দগুলো মাঠের নাটকীয়তা, সৌন্দর্য আর অদ্ভুত সব মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলে।
নতুনদের কাছে ‘স্কুইকি বাম টাইম’ বা ‘টপ বিন’ বিদেশি ভাষা মনে হতে পারে। তবে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এগুলো এমন কিছু আবেগ, এটি পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো অসম্ভব।
যেমন ‘স্কুইকি বাম টাইম’। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের কল্যাণে এটি জনপ্রিয় হয়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তের স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনা বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের শেষ মিনিটের সমতার কথা ভাবা যাক। প্রতিটি পাস তখন অনেক ভারী, প্রতিটি ভুল অনেক দামি। এটাই ‘স্কুইকি বাম টাইম’।
অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিও একে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের মতে, ‘কোনো প্রতিযোগিতার চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে প্লাস্টিকের সিটে বসে কারও ছটফট করার শব্দই এটি।’
আবেগের উল্টো পিঠে রয়েছে ‘পার্কিং দ্য বাস’। প্রতিপক্ষ গোলের সামনে আস্ত একটা বাস দাঁড় করিয়ে দিয়েছে— হোসে মরিনহোর এমন এক ঠাট্টা থেকে শব্দটির জন্ম। অতি-রক্ষণাত্মক খেলার কৌশল বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। বড় দলের মুখোমুখি হয়ে দুর্বল দলগুলো সাধারণত এই কৌশল নেয়। তারা আক্রমণ ভুলে শুধু গোল খাওয়া থেকে বাঁচতে লড়ে।
কিছু শব্দ আবার দারুণ সব জাদুকরী মুহূর্তের প্রশংসা করে। যেমন ‘ওয়ার্ল্ডডি’। অবিশ্বাস্য কোনো গোল বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। সাধারণত দূর থেকে নেওয়া জোরালো শট বা নিখুঁতভাবে কোণ ঘেঁষে জালে জড়ানো গোলই এই তালিকায় পড়ে। শট গোলপোস্টের একেবারে ওপরের কোণ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সমর্থকরা তাকে বলেন ‘টপ বিন’।
সব স্মরণীয় মুহূর্ত অবশ্য আনন্দের হয় না। কোনো স্ট্রাইকার ফাঁকা পোস্টে গোল করতে না পারলে বলা হয় তিনি ‘সিটার’ মিস করেছেন। এই সুযোগগুলো মিস করার চেয়ে গোল করাই সহজ, তাই এই ব্যর্থতা অনেক বেশি কষ্টের।
এরপর আছে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর শিল্প। ফুটবলে ‘নাড়মেগ’-এর চেয়ে দর্শকদের বেশি আনন্দ আর কিছুই দেয় না। প্রতিপক্ষের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে বল গলিয়ে বের করে নেওয়া বা সতীর্থকে পাস দেওয়াই নাড়মেগ। দুনিয়াজুড়ে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকলেও এর ভেতরের অপমানটুকু সবাই বোঝে।
বিশ্বকাপে পেনাল্টি স্পট থেকেও দুঃসাহসিক মুহূর্ত দেখা যেতে পারে। পেনাল্টি থেকে গোলপোস্টের মাঝ বরাবর আলতো চিপ শটকে ‘পানেনকা’ বলা হয়। চেক খেলোয়াড় আন্তোনিন পানেনকার নামানুসারে এর নামকরণ। ১৯৭৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই টেকনিকে তিনি দলকে জিতিয়েছিলেন। নিখুঁত হলে এটি এক অনন্য শিল্প, ভুল হলে মুহূর্তে হাসির পাত্র।
সবশেষে আছে ‘১২তম খেলোয়াড়’। মাঠে ১১ জন খেললেও সমর্থকরা পান অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের মর্যাদা। অনবরত স্লোগান, অবিচল বিশ্বাস আর গ্যালারির গর্জন দিয়ে তারা স্টেডিয়ামের চেহারা বদলে দেন, এটি ম্যাচের পরিবেশেও প্রভাব ফেলে।
উত্তর আমেরিকা জুড়ে বিশ্বকাপ যত গড়াবে, এই শব্দগুলো স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন ও স্পোর্টস বারে তত বেশি প্রতিধ্বনিত হবে। এগুলো কেবল কথ্য ভাষা নয়, ফুটবল সংস্কৃতির অংশ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এবং এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়া এই শব্দগুলো দিয়েই সমর্থকরা দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার সুন্দর মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলেন।


